বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১০:৫০ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

চারবার প্রত্যাখ্যান, তবু হাল ছাড়েনি ইসি: ৬৫ পদ উন্নীত করতে আবারও জনপ্রশাসনের দ্বারে

ছবি: সংগৃহীত

চারবার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পরও হাল ছাড়েনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক জটিলতা, পদমর্যাদাগত বৈষম্য ও দীর্ঘদিনের পদোন্নতি-সংকট নিরসনের লক্ষ্যে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার ৬৫টি পদ ৬ষ্ঠ থেকে ৫ম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাব আবারও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠপর্যায়ে কাজের গতি বাড়ানো, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘদিনের পদমর্যাদাগত অসামঞ্জস্য দূর করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে একই বিষয়ে একাধিকবার প্রস্তাব পাঠানো হলেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তাতে সম্মতি দেয়নি।

ইসির নতুন প্রস্তাবে ৪৫টি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ২০টি অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার পদ ৬ষ্ঠ গ্রেড থেকে ৫ম গ্রেডে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা ৬ষ্ঠ গ্রেডের ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬৭ হাজার ১০ টাকা বেতন স্কেলে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রস্তাব অনুমোদন হলে তাদের পদ ৫ম গ্রেডে উন্নীত হয়ে বেতন স্কেল দাঁড়াবে ৪৩ হাজার থেকে ৬৯ হাজার ৮৫০ টাকা।

দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে বর্তমানে ১৯টি জেলায় ৫ম গ্রেডের সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ৪৫টি জেলায় ৬ষ্ঠ গ্রেডের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। ইসির যুক্তি, দায়িত্ব ও কাজের ধরন প্রায় একই হলেও কর্মকর্তাদের পদমর্যাদায় এমন বৈষম্য মাঠ প্রশাসনে সমন্বয়হীনতা তৈরি করছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে সম্প্রতি ৪৫টি জেলায় ৬ষ্ঠ গ্রেডের অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি হওয়ায়। এতে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা ও অধীন কর্মকর্তার গ্রেড একই হয়ে গেছে, যা প্রশাসনিক কাঠামোতে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার ২০টি পদও বর্তমানে ৬ষ্ঠ গ্রেডে রয়েছে। আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা অনুপস্থিত থাকলে এসব কর্মকর্তা তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণে বিভাগীয় পর্যায়ের অন্যান্য দপ্তরের সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পদমর্যাদাগত সামঞ্জস্য আনতেও তাদের পদ ৫ম গ্রেডে উন্নীত করার সুপারিশ করেছে ইসি।

ইসি বলছে, প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে সরকারের বাড়তি কোনো আর্থিক ব্যয় হবে না। কারণ কর্মকর্তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে উচ্চতর স্কেলে বেতন পাচ্ছেন। ফলে বিষয়টি মূলত পদমর্যাদা, প্রশাসনিক কাঠামোর ভারসাম্য এবং কর্মকর্তাদের সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশনেরও এ উদ্যোগে পূর্ণ সম্মতি রয়েছে বলে জানিয়েছে ইসি সচিবালয়।

ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক জটিলতার বড় একটি কারণ পদমর্যাদার অসামঞ্জস্য। কোথাও ৬ষ্ঠ গ্রেডের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার অধীনে ৫ম গ্রেডের অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়েছে। আবার ১৯টি জেলায় সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার পদ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তারাই দায়িত্ব পালন করছেন। একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেও কর্মকর্তাদের গ্রেডে এই পার্থক্য দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ তৈরি করছে।

কর্মকর্তাদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামোয় দায়িত্ব, ক্ষমতা ও পদমর্যাদার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের মাঠপর্যায়ের কাঠামোয় দীর্ঘদিন ধরে সেই ভারসাম্য নেই। এর ফলে দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নিয়ন্ত্রণ এবং পারস্পরিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

পদমর্যাদার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে ২০০৫ ব্যাচকে ঘিরে। ইসির সর্বশেষ গ্রেডেশন তালিকায় মোট ৭৩৮ কর্মকর্তার মধ্যে মাঠপর্যায়ে কর্মরত রয়েছেন ৭২১ জন। এর মধ্যে ২০০০ ও ২০০৪ ব্যাচের পদোন্নতি সম্পন্ন হলেও ২০০৫ ব্যাচের শতাধিক কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় ধরে একই পদে আটকে আছেন।

প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পদোন্নতি না পাওয়ায় এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সম্প্রতি প্রায় ৮০ জন কর্মকর্তা যোগদান করলেও তাদের অনেকেই আগের পদেই বহাল রয়েছেন। ফলে জ্যেষ্ঠতার জটিলতা কাটছে না।

এই জট খুলতে না পারলে ২০০৫ সালের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রায় ৪২০ জন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার পদোন্নতিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। কারণ জ্যেষ্ঠতার বিধিমালা অনুযায়ী আগের ব্যাচের পদোন্নতির জট না কাটলে পরবর্তী ব্যাচগুলোর পদোন্নতির পথও কার্যত বন্ধ থাকে।

ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তাদের অনেকেই টাইমস্কেল বা উচ্চতর স্কেলে বেতন পাচ্ছেন। ফলে তাদের দাবি মূলত অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা পাওয়ার জন্য নয়; বরং পদমর্যাদা, পেশাগত স্বীকৃতি ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের পদ উন্নীত করার উদ্যোগ নতুন নয়। এর সূত্রপাত ২০১৮ সালে। পরে ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ ৪৫টি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার পদ ৫ম গ্রেডে উন্নীত করার পাশাপাশি ইলেকশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (ইটিআই) মহাপরিচালকের পদ ৩য় থেকে ২য় গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠান।

তবে ফিডার পদের অসংগতির কথা উল্লেখ করে সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এরপর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার এবং ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট তৃতীয়বার পূর্ণ কমিশনের অনুমোদন নিয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু সেসব উদ্যোগও সফল হয়নি।

এরপর গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ইসির বর্তমান সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ চতুর্থবারের মতো ৪৫টি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ২০টি অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার পদ ৫ম গ্রেডে উন্নীত করার প্রস্তাব পাঠান। সর্বশেষ গত ১২ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংস্থাপন ও ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের (সওব্য-১৩) এক চিঠিতে ওই প্রস্তাবেও অসম্মতির কথা জানানো হয়।

চারবার প্রত্যাখ্যানের পরও এবার আবারও একই প্রস্তাব পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, বিষয়টিকে শুধু পদ উন্নীতকরণের দাবি হিসেবে দেখছে না কমিশন; বরং নির্বাচন ব্যবস্থাপনার মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই দেখছে।

চারবার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পরও কেন আবার উদ্যোগ নেওয়া হলো- এমন প্রশ্নে ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, কমিশন তার অবস্থানে অনড়। তাদের মতে, প্রস্তাবটি যৌক্তিক এবং বাস্তব প্রশাসনিক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রয়োজন হলে কমিশনের নতুন অনুমোদন নিয়ে অথবা প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আবারও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে।

বাংলাদেশ ইলেকশন কমিশন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারাও বিষয়টি নিয়ে আশাবাদী। তাদের যুক্তি, সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন পাস হওয়ায় ইসি সচিবালয় ক্যাডার বা নন-ক্যাডার কাঠামোর বাইরে একটি স্বতন্ত্র ‘সার্ভিস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়েছে। সেই কাঠামো কার্যকর করতে হলে দায়িত্ব, পদমর্যাদা ও সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যেও সামঞ্জস্য আনা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, চারবার প্রত্যাখ্যানের পরও ৬৫টি পদ উন্নীত করার এই পুনর্প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনের জন্য কেবল একটি প্রশাসনিক আবেদন নয়; বরং দীর্ঘদিনের পদমর্যাদাগত বৈষম্য, পদোন্নতির জট এবং মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে একটি সুসংহত নির্বাচন প্রশাসন গড়ে তোলার বড় পরীক্ষাও। এখন দেখার বিষয়, এবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইসির এই অনড় অবস্থান ও যুক্তিগুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে।

বাংলাধারা/শারমিন

 

মন্তব্য করুন