প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১২:২৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সব অধিদপ্তর ও সংস্থার সরকারি রাজস্ব ডিজিটাল পদ্ধতিতে ‘এ-চালান’-এর মাধ্যমে গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নয়টি সংস্থাকে চিঠি দিয়ে ম্যানুয়াল চালানের পরিবর্তে এ-চালানের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে। যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগের পেছনে মূল অনুরোধ জানিয়েছে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর। সংস্থাটির সরকারি রাজস্ব এ-চালানের মাধ্যমে ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে (টিএসএ) জমা নিশ্চিত করার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য অধিদপ্তর ও সংস্থাতেও একই ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা-৪ শাখার উপসচিব বিকাশ বিশ্বাস স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে সরাসরি নির্দেশনা বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও সংস্থাগুলোর সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে মতামত নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়ের একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর কর্তৃক সরকারি সব রাজস্ব ‘এ-চালান’-এর মাধ্যমে ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে (টিএসএ) জমা নিশ্চিতকরণ এবং ম্যানুয়াল চালান পদ্ধতি রহিত করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সব দপ্তরে ম্যানুয়াল চালানের পরিবর্তে এ-চালানের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
চিঠিটি পুলিশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, কারা অধিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (এনটিএমসি) দেওয়া হয়েছে। এসব সংস্থার মহাপরিচালক এবং সংশ্লিষ্ট প্রধানদের কাছে পাঠানো চিঠিতে দ্রুত এ-চালানের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল চালান ব্যবস্থায় অর্থ জমা, হিসাব সংরক্ষণ, যাচাই ও সমন্বয়ে সময় লাগে। একই সঙ্গে কাগজপত্র সংরক্ষণ এবং অর্থ জমার তথ্য যাচাইয়েও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। ডিজিটাল এ-চালান ব্যবস্থায় রাজস্ব জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর একটি ইলেকট্রনিক রেকর্ড তৈরি হবে। ফলে কোন খাতে কত টাকা জমা হয়েছে, কখন জমা হয়েছে এবং কোন সেবা বা দপ্তরের বিপরীতে অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে এসব তথ্য সহজে যাচাই করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র বলছে, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অন্যান্য সংস্থায় এ-চালান চালু করা হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থার রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামো তৈরি হতে পারে। তবে মন্ত্রণালয়ের চিঠির পর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা ও প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হতে পারে। এরপর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সমন্বয় শেষে পর্যায়ক্রমে ম্যানুয়াল চালান পদ্ধতি পুরোপুরি বন্ধ করে এ-চালানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এ বিষয়ে প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল পদ্ধতি চালু হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের সুযোগও কমতে পারে। সরকারি রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থা যত বেশি বিস্তৃত হবে, আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা তত বাড়বে। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে যে জায়গাগুলোতে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকে, ডিজিটাল ব্যবস্থায় সেগুলো অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, তবে এ-চালান বাস্তবায়নের আগে প্রতিটি সংস্থার রাজস্ব আদায়ের ধরন ও অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু সফটওয়্যার চালু করলেই হবে না, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও প্রস্তুত করতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সব সংস্থার কার্যক্রম এক ধরনের নয়। পুলিশের বিভিন্ন ফি, ফায়ার সার্ভিসের সেবা ফি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন রাজস্ব এবং অন্যান্য সংস্থার অর্থ গ্রহণের ধরন আলাদা। ফলে একটি অভিন্ন ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাওয়ার আগে প্রতিটি সংস্থার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জনবল, ইন্টারনেট সংযোগ এবং বিদ্যমান হিসাব ব্যবস্থার সঙ্গে এ-চালান ব্যবস্থার সমন্বয় কতটা সম্ভব তা যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল অব. কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, এ-চালান শুধু অর্থ জমার পদ্ধতি পরিবর্তন করবে না, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় তথ্যভিত্তিক নজরদারির সুযোগও বাড়াবে। কোন সংস্থা কী পরিমাণ রাজস্ব আদায় করছে, কোন খাতে কত অর্থ জমা হচ্ছে এসব তথ্য দ্রুত পাওয়া সম্ভব হবে। প্রত্যন্ত এলাকার অফিসগুলোতে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সিস্টেমে সমস্যা হলে দ্রুত সমাধানের জন্য কেন্দ্রীয় কারিগরি সহায়তা রাখা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সরকারি অর্থ গ্রহণের ক্ষেত্রে ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে অডিট ও হিসাব যাচাই সহজ হবে। অর্থ জমার প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকায় অনিয়ম শনাক্ত করার সুযোগও বাড়বে। রাজস্ব আদায়ের পুরো প্রক্রিয়া ট্র্যাকযোগ্য হলে জবাবদিহি বাড়ে। এ-চালান ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, অর্থ জমার তথ্য গোপন বা পরিবর্তন করার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কমে যায়। তবে ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত অডিট ও সিস্টেম মনিটরিং ছাড়া শুধু প্রযুক্তি নির্ভরতা যথেষ্ট নয়।
বাংরাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন