প্রকাশিত: ২১ ঘন্টা আগে, ০৫:১০ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
একসময় দেশের অন্যতম প্রাণবন্ত শিল্পখাত হিসেবে পরিচিত ছিল চট্টগ্রামের চামড়াশিল্প। পাকিস্তান আমল থেকে গড়ে ওঠা এই শিল্পনগরীতে ওরিয়েন্ট, মেঘনা, জুবিলি, কর্ণফুলী ও চিটাগাং লেদারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই নয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির মাধ্যমে বছরে কোটি কোটি টাকার আয় হতো, আর হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থানের কেন্দ্র ছিল এই খাত।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই ঐতিহ্য এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে অক্ষমতা, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব ও নীতিগত সহায়তার ঘাটতিতে একে একে বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ ট্যানারি। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টিকে থাকলেও পুরো শিল্পখাতই এখন টালমাটাল অবস্থায়।
এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে গবাদিপশুর ভাইরাসজনিত চর্মরোগ ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি)’। এই রোগে আক্রান্ত পশু সুস্থ হলেও চামড়ার গুণগত মান স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় চামড়ার গ্রহণযোগ্যতা আরও কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই রোগের সংক্রমণ বেড়েছে, আর পর্যাপ্ত টিকা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
চামড়া ব্যবসায়ীদের মতে, কোরবানির ঈদকে ঘিরে প্রতি বছর যে বাজার তৈরি হয়, সেটিও এখন অনিশ্চয়তায় ভুগছে। সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় বাস্তবে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। উপরন্তু ঢাকার বড় ক্রেতারা চট্টগ্রামে না আসায় বিপুল পরিমাণ চামড়া নামমাত্র মূল্যে ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এতে ধারাবাহিক লোকসানে পড়ে একসময়কার ১২২ জন সক্রিয় ব্যবসায়ী এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ জনে।
খাত সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পরও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। আন্তর্জাতিক মানের ইটিপি ও এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় রপ্তানি বাজারেও ধাক্কা খেতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি ট্যানারি সচল থাকলেও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান খুবই সীমিত।
অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে ভ্যাকসিন সংকট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। সরকারি টিকা সরবরাহ সীমিত, আর বেসরকারি টিকার দাম বেশি হওয়ায় প্রান্তিক খামারিরা পশুকে নিয়মিত টিকার আওতায় আনতে পারছেন না। ফলে লাম্পি স্কিন ডিজিজ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, বিশেষ করে বাছুরগুলো বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে আনোয়ারা উপজেলায়, খামারিদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। কোরবানির আগে গরু আক্রান্ত হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা।
এই সংকট মোকাবিলায় সরকারও কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কোরবানির চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিশেষ সভা করেছে এবং চামড়া যাতে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
তবে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। পরিবেশগত মান নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং মাঠপর্যায়ে টিকার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা- এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে চট্টগ্রামের শতবর্ষী চামড়াশিল্প হারিয়ে যেতে পারে ইতিহাসের পাতায়।
বাংলাধারা/এসআর
মন্তব্য করুন