প্রকাশিত: ৮ ঘন্টা আগে, ০৪:৪৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সবচেয়ে আপনজনদের কাছেই আশ্রয় খোঁজেন মানুষ। কিন্তু টাঙ্গাইলের শতবর্ষী মফিজ উদ্দিনের জীবনে ঘটেছে ঠিক উল্টোটি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, প্রায় দৃষ্টিশক্তিহীন এই বৃদ্ধকে পরিবারের সদস্যরা বাড়ি থেকে নিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে যান। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে নিরাপদে মেয়ের জিম্মায় পৌঁছে দেয় পুলিশ। একই সঙ্গে তার চিকিৎসা, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব নিয়েছেন টাঙ্গাইল সদর আসনের সংসদ সদস্য ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সন্ধ্যায় টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বল্লা ইউনিয়নের বইল্লা এলাকার একটি সেতুর পাশে কান্নারত অবস্থায় মফিজ উদ্দিনকে দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে তারা এগিয়ে গিয়ে তার পরিচয় নিশ্চিত করেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এনায়েতপুর গ্রামের বাসিন্দা মফিজ উদ্দিন তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। প্রায় আট বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি অসহায় জীবন কাটাচ্ছেন। তার এক ছেলে মারা গেছেন, বড় ছেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং ছোট ছেলে আলাদা সংসার করেন। জীবনের শেষ সম্বলটুকুও মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে দুই ছেলের নামে লিখে দেওয়ার পর পরিবারে তার অবস্থান আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এলাকাবাসী জানান, এতদিন তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত বড় ছেলে শামসুলের বাড়িতে থাকতেন। ছেলের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সেখানে নাতনি ও তার স্বামী বসবাস শুরু করেন। তারা বৃদ্ধের দেখাশোনা করতে অনাগ্রহী ছিলেন। একপর্যায়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাকে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে চলে যান। দীর্ঘ সময় অসহায় অবস্থায় সেখানে বসে কাঁদছিলেন তিনি।
ঘটনার খবর প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর কাছে পৌঁছালে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে টাঙ্গাইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। নির্দেশনা পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে তার ছোট মেয়ে রিনা বেগমের জিম্মায় হস্তান্তর করে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ ঘটনায় বৃদ্ধের নাতনিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে তার স্বামী পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান।
উদ্ধারের পাশাপাশি বৃদ্ধের চিকিৎসা, খাবার, বাসস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার ব্যক্তিগতভাবে বহনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। দ্রুত তার জন্য বৃদ্ধভাতার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আলাদা কক্ষ ভাড়া করে দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
প্রথমদিকে বাবার দায়িত্ব নিতে অনীহা প্রকাশ করলেও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার পর ছোট মেয়ে রিনা বেগম বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে সম্মত হন।
রিনা বেগম বলেন, পাশের বাড়ির লোকজনের মাধ্যমে জানতে পারি বাবাকে রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়েছে। বাবাকে ওই অবস্থায় দেখে খুব কষ্ট পেয়েছি। প্রতিমন্ত্রী আমার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এখন থেকে বাবার দায়িত্ব আমিই পালন করব।
টাঙ্গাইল সদর থানার ওসি গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন বলেন, প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে। তিনি বর্তমানে তার ছোট মেয়ের হেফাজতে রয়েছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, একজন অসহায় বৃদ্ধকে এভাবে রাস্তায় ফেলে রেখে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত অমানবিক ও হৃদয়বিদারক। বাবা-মা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তাদের অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। যতদিন প্রয়োজন, এই বৃদ্ধের চিকিৎসা, থাকা-খাওয়া ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার দায়িত্ব আমি নেব। একই সঙ্গে যারা তাকে এভাবে পরিত্যাগ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সমাজের প্রতিটি মানুষের উচিত অসহায় প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানো।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন