প্রকাশিত: ৯ ঘন্টা আগে, ০৩:৫৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
টানা কয়েকদিনের বর্ষণ এবং ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুমিল্লার গোমতী নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। এখনও পানি বিপৎসীমার অনেক নিচে থাকলেও নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের নিচু জমিতে ইতোমধ্যে পানি প্রবেশ করেছে। কোথাও কোথাও তলিয়ে গেছে মৌসুমি ফসল। ফলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা নয়, বরং গত বছরের ভয়াবহ দুর্যোগের স্মৃতি ফিরে আসায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন চরাঞ্চলের বাসিন্দারা।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, গোমতী নদীর পানি ৮ দশমিক ৫৯ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর বিপৎসীমা নির্ধারিত রয়েছে ১১ দশমিক ৩০ মিটারে। অর্থাৎ পানি এখনও বিপৎসীমার অনেক নিচে থাকলেও কৃষকদের উদ্বেগ বাড়ছে প্রতিদিন।
কুমিল্লার আদর্শ সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও দেবিদ্বার উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে নদীর পানি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে সীমান্তঘেঁষা আদর্শ সদর উপজেলার কয়েকটি চর ইতোমধ্যেই পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সবজি ও মৌসুমি ফসলের ক্ষতি শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে অনেক কৃষক পরিপক্ব হওয়ার আগেই ক্ষেত থেকে ফসল তুলে নিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার পানিতে ডুবে যাওয়ার আগেই যা পাওয়া যায়, তাই সংগ্রহ করে বাজারজাত করার চেষ্টা করছেন।
২০২৪ সালের আগস্টের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায় এ অঞ্চলের মানুষকে। ওই বছরের ২১ আগস্ট ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বৃষ্টিতে বুড়িচং উপজেলার বুড়বুড়িয়া এলাকায় বদীর বাঁধ ভেঙে যায়। মুহূর্তেই প্লাবিত হয় শত শত গ্রাম। হাজার হাজার বসতঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক এবং বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায়। প্রাণ হারান অন্তত ১৪ জন। সেই দুর্যোগের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারও নদীর পানি বাড়তে থাকায় উৎকণ্ঠায় রয়েছেন স্থানীয়রা।
বুড়িচং উপজেলার ইছাপুরা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রব বলেন, “২০২৪ সালের বন্যা আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। চোখের সামনে সবকিছু শেষ হয়ে যেতে দেখেছি। অনেক কষ্টে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। এবার যদি আবার বড় বন্যা হয়, তাহলে আর টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।”
সদর উপজেলার ডুমুরিয়া চাঁনপুর এলাকার বাসিন্দা আনাস রহমান বলেন, “গত বন্যায় চরের মাটি ভেঙে অনেক ক্ষতি হয়েছে। এবার আবার পানি বাড়ছে। তাই সবজি পুরোপুরি বড় হওয়ার আগেই তুলে নিচ্ছি। যতটুকু বিক্রি করা যায়, সেটাই এখন ভরসা।”
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় গোমতী নদীর পানির উচ্চতা ৮ দশমিক ৯৩ মিটারে পৌঁছালেও পরে তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় পানি নেমে আসে ৮ দশমিক ৮৬ মিটারে এবং শুক্রবার সকাল ৯টায় তা আরও কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৫৯ মিটারে। শুক্রবার সকাল থেকে কুমিল্লা অঞ্চলে বৃষ্টিপাতও তুলনামূলক কম হওয়ায় পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, গোমতীর পানি এখনও বিপৎসীমার অনেক নিচে রয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আপাতত আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
একই আশ্বাস দিয়েছেন কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মিজ রোজী আকতারও। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবারের তুলনায় শুক্রবার নদীর পানি কিছুটা কমেছে। এখনো বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। তবে সম্ভাব্য যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসন পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
যদিও সরকারি হিসাবে পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক, তবু গোমতীর তীরের মানুষের কাছে নদীর বাড়ন্ত পানি মানেই এক গভীর শঙ্কার নাম। কারণ, ২০২৪ সালের ভয়াল বন্যার স্মৃতি তাদের এখনো তাড়া করে ফেরে। তাই নদীর প্রতিটি সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধিই তাদের কাছে নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন