প্রকাশিত: ১৩ ঘন্টা আগে, ১১:৫১ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
টিকিট কাউন্টারের সামনে অপেক্ষা করছেন কুমিল্লার হোমনা থেকে আসা আফসানা বেগম। পাশেই ১৫ বছর বয়সী মেয়ে, দাঁড়িয়ে আছে মায়ের হাতে হাত রেখে। কয়েক বছর ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছে সে। স্থানীয় কবিরাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন চিকিৎসকের দ্বারস্থ হয়েছেন। কোথাও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। শেষ ভরসা হিসেবে রাজধানীর এ হাসপাতালেই এসেছেন।
আফসানা বেগম বলেন, ‘অনেক জায়গায় ঘুরেছি। শেষে এখানে এসে একটু ভরসা পেয়েছি। কিন্তু রোগী এত বেশি যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তার পরও ভালো চিকিৎসার আশায় আসি।’ আফসানার মতো প্রতিদিনই দেশের নানা প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ ভিড় করছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। গত কয়েক বছরে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সাইকোসিস, মাদকাসক্তি, আত্মহত্যাপ্রবণতা এবং শিশু-কিশোরদের মানসিক সমস্যাও। সে তুলনায় বাড়েনি হাসপাতালের জনবল ও সেবা সক্ষমতা।
রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপ বিবেচনায় কয়েক বছর আগে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ২০০ থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ, অর্থাৎ ৪০০ করা হয়। কিন্তু শয্যা বাড়ালেও চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যাটা আগেরই রয়ে গেছে। ফলে নতুন ভবন ও অতিরিক্ত শয্যার পুরো সুবিধা পাচ্ছেন না রোগীরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৪০০ শয্যার জন্য প্রয়োজনীয় নতুন জনবল কাঠামো এখনো অনুমোদন পায়নি। অর্থাৎ বর্তমানে হাসপাতালটি পরিচালিত হচ্ছে ২০০ শয্যার জন্য নির্ধারিত জনবল দিয়েই। আবার বিদ্যমান জনবলেও রয়েছে বড় ধরনের শূন্যতা।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত অনুমোদিত ৮৪টি পদের মধ্যে চিকিৎসকের পদ ৭৯টি। বর্তমানে কর্মরত আছেন কেবল ৫৭ জন। অর্থাৎ চিকিৎসকের ২২টি পদই খালি। অন্যদিকে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত অনুমোদিত ১৩০টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৭৭ জন। খালি পড়ে রয়েছে ৫৩টি পদ। সব মিলিয়ে অনুমোদিত ২১৪টি পদের মধ্যে ৭৫টি দীর্ঘদিন ধরেই শূন্য। শুধু সংখ্যার সংকটই নয়, বিশেষায়িত জনবলের অভাবও প্রকট। হাসপাতালে নেই কোনো স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, রিক্রিয়েশনাল থেরাপিস্ট কিংবা ফিজিওথেরাপিস্ট। অথচ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক রোগীদের পুনর্বাসন ও দৈনন্দিন জীবনে ফিরিয়ে আনতে এসব বিশেষজ্ঞের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ তায়েবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা জনবল। শয্যা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু সে অনুযায়ী পদ সৃষ্টি হয়নি। বিদ্যমান পদগুলোরও অনেকগুলো খালি। ফলে সীমিত জনবল দিয়েই বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে।’
বর্তমানে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কাজে লাগানো হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণে আসা নার্সদেরও সেবাকাজে যুক্ত করি। কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। শুধু চিকিৎসক নয়; ওয়ার্ড বয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বিভিন্ন সাপোর্টিং স্টাফেরও সংকট রয়েছে। অনেক সময় ক্লিনারদের দিয়েই ওয়ার্ড বয়ের দায়িত্ব পালন করাতে হচ্ছে।””মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত নার্সেরও রয়েছে বেশ অভাব। এ কারণে হাসপাতালের নিজস্ব অর্থায়নে বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্য নার্স তৈরির একটি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা হয়েছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে জনবল নিয়োগ ছাড়া এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়।’
রোগীর চাপের চিত্রও উদ্বেগজনক। হাসপাতালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ভর্তি ছিলেন ৬ হাজার ৮০৪ রোগী। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৮ এবং জরুরি বিভাগে ৯ হাজার ৬৫০ জন সেবা নিয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই নতুন ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৭৩৩ জন। একই সময়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫৭ হাজার ৫৪৪ এবং জরুরি বিভাগে সেবা নিয়েছেন ৪ হাজার ৮৭১ জন। একই ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি বছর রোগীর সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন হাসপাতালসংশ্লিষ্টরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দ্রুত বাড়লেও সে অনুপাতে বাড়েনি জনবল কিংবা বাজেট। জেলাপর্যায়ে বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো সীমিত। ফলে অধিকাংশ রোগীকেই শেষ পর্যন্ত রাজধানীর এ একটি সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তাদের মতে, শুধু শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে এ সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন পর্যাপ্ত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিক নার্স, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, রিক্রিয়েশনাল থেরাপিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবল নিয়োগ। একই সঙ্গে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ঘটাতে হবে। নইলে রাজধানীমুখী রোগীর চাপ আরো বাড়বে।
বহির্বিভাগের দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা রোগী ও স্বজনদের অভিজ্ঞতাও বলছে, দেশের একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি মানসিক হাসপাতালটি এখন সক্ষমতার প্রায় শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ভবন বড় হয়েছে, শয্যা বেড়েছে,
কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না বাড়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মচাপ। এর প্রভাব পড়ছে রোগীর অপেক্ষার সময়, চিকিৎসাসেবার গতি এবং সামগ্রিক সেবার মানের ওপর।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কিছু সংকট রয়েছে। সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। তবে আমরা কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দিই না। সবার সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি।’
মন্তব্য করুন