প্রকাশিত: ১৭ ঘন্টা আগে, ১২:১৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার গল্প যেমন ইতিহাসে বারবার লেখা হয়েছে, তেমনি ক্ষমতার পতনের ঘটনাগুলোও যুগে যুগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে। স্বৈরশাসনের অবসান, গণ-আন্দোলনের বিজয়, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র কিংবা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার হাত ধরে সরকারের পতন, এসব ঘটনাই বহু নির্মাতাকে অনুপ্রাণিত করেছে স্মরণীয় চলচ্চিত্র নির্মাণে। এসব সিনেমা শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা, ইতিহাস এবং রাষ্ট্রক্ষমতার উত্থান-পতনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও বিবেচিত।
এমনই ছয়টি আলোচিত সিনেমা নিয়ে এই আয়োজন-
১. ডাউনফল (Downfall, ২০০৪)
নাৎসি জার্মানির একনায়ক অ্যাডলফ হিটলারের শাসনের শেষ কয়েকটি দিনকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই জার্মান চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন অলিভার হার্শবিগেল। বার্লিনে মিত্রবাহিনীর চূড়ান্ত আক্রমণের মুখে বাঙ্কারে আটকে থাকা হিটলার ও তার ঘনিষ্ঠদের মানসিক অবস্থা, বিভ্রান্তি এবং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্রের ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ার দৃশ্য অত্যন্ত বাস্তবভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ক্ষমতার চূড়ায় থাকা শাসকের শেষ পরিণতি বুঝতে 'ডাউনফল' বিশ্বসিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র।
২. নো (No, ২০১২)
চিলির স্বৈরশাসক অগাস্টো পিনোচেতের পতনের বাস্তব ঘটনা নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি রাজনৈতিক প্রচারণার শক্তির এক অনন্য উদাহরণ। ১৯৮৮ সালের গণভোটে 'না' প্রচারণার মাধ্যমে কীভাবে সাধারণ মানুষ সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল, সেটিই সিনেমার মূল বিষয়। সহিংসতার বদলে সৃজনশীল প্রচারণা এবং জনগণের ঐক্য যে ইতিহাস বদলে দিতে পারে, তা অসাধারণভাবে তুলে ধরা হয়েছে এতে।
৩. দ্য ডেথ অব স্ট্যালিন (The Death of Stalin, ২০১৭)
সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে শীর্ষ নেতাদের দ্বন্দ্ব ও ষড়যন্ত্রকে ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে তুলে ধরেছে এই রাজনৈতিক স্যাটায়ার। হাস্যরসের আড়ালে চলচ্চিত্রটি দেখায়, একজন সর্বময় ক্ষমতাধর নেতার পতনের পর কীভাবে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়ে যায়।
৪. ভি ফর ভেনডেটা (V for Vendetta, ২০০৫)
একটি কাল্পনিক স্বৈরশাসিত রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে একজন মুখোশধারী বিপ্লবীর নেতৃত্বে কীভাবে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ব্যক্তিগত প্রতিবাদ ধীরে ধীরে গণ-আন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত স্বৈরতন্ত্রের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। স্বাধীনতা, প্রতিরোধ এবং জনগণের শক্তির প্রতীক হিসেবে চলচ্চিত্রটি আজও সমান জনপ্রিয়।
৫. দ্য লাস্ট কিং অব স্কটল্যান্ড (The Last King of Scotland, ২০০৬)
উগান্ডার কুখ্যাত শাসক ইদি আমিনের শাসনামলের পটভূমিতে নির্মিত এই সিনেমাটি এক তরুণ স্কটিশ চিকিৎসকের চোখে ক্ষমতার ভয়াবহ অপব্যবহার তুলে ধরে। একনায়কতন্ত্র, ভয়ভীতি এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার পাশাপাশি একজন শাসকের পতন কীভাবে একটি দেশের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, তা শক্তিশালীভাবে ফুটে উঠেছে এতে।
৬. অল দ্য প্রেসিডেন্টস মেন (All the President's Men, ১৯৭৬)
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি এবং তার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গল্প নিয়ে নির্মিত এই ক্লাসিক চলচ্চিত্রটি দেখায়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সত্য অনুসন্ধানের শক্তি কতটা প্রভাবশালী হতে পারে। দুই সাংবাদিকের ধারাবাহিক অনুসন্ধানের ফলে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগের পথ তৈরি হয়। কোনো গণ-আন্দোলন নয়, বরং তথ্য ও সত্য প্রকাশের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ এই সিনেমা।
ক্ষমতার পতনের গল্প কখনো যুদ্ধের মাধ্যমে, কখনো গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, আবার কখনো সাংবাদিকতার অনুসন্ধান বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মাধ্যমে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। এই ছয়টি চলচ্চিত্র ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নির্মিত হলেও একটি জায়গায় এসে মিলিত হয়েছে, কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ইতিহাসকে নতুন দৃষ্টিতে বুঝতে আগ্রহীদের জন্য সিনেমাগুলো নিঃসন্দেহে দেখার মতো।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন