বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ২২ ঘন্টা আগে, ০৬:০৯ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

বেলুয়া নদীর বুকে ভাসমান বাজার, ৪ ঘণ্টায় ৭০ লাখ টাকার কেনাবেচা

ছবি; সংগৃহিত

ভোরের আলো ফুটতেই নদীর বুকে ভিড়তে শুরু করে একের পর এক নৌকা। কোনো নৌকায় শাকসবজি, কোনো নৌকায় ধান-চাল আর কোনো নৌকায় আখসহ অন্য কৃষিপণ্য। একেকটি নৌকা যেন হয়ে ওঠে একেকটি ভাসমান দোকান। নৌকা থেকে নৌকায় চলে দরদাম, কেনাবেচা। কয়েক ঘণ্টার জন্য নদীর জলে গড়ে ওঠে জমজমাট বাজার।
নদীর জলে ভাসমান এ বাজার বসে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটা বাজারসংলগ্ন বেলুয়া নদীতে। সপ্তাহে দুই দিন বসে এই ব্যতিক্রমী হাট। জলকেন্দ্রিক বাজার ও নদী-নৌকানির্ভর জীবনযাত্রার এ ব্যবস্থার সঙ্গে ইতালির ভেনিস শহরের জলপথকেন্দ্রিক জীবনের মিল খুঁজে পান স্থানীয়রা। সে কারণে বৈঠাকাটা বাজারকে কেউ কেউ ‘বাংলার ভেনিস’ বলেন।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় ভাসমান বাজার হিসেবে পরিচিত বৈঠাকাটা বাজারটি পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ এবং বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার মানুষের বাণিজ্যিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নাজিরপুর উপজেলার অংশে বেলুয়া নদীর প্রায় এক কিলোমিটার জলজুড়ে বাজারটি বসে।
নাজিরপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ বাজারে ভোর থেকেই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পাইকাররা নৌকা নিয়ে আসেন।

শনিবার ও মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় কেনাবেচা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে বাজার। বেচাকেনা হয় খুব দ্রুত। ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে বিকিকিনি শেষ করে বেলা ১১টার মধ্যে অধিকাংশ নৌকা ফিরে যেতে শুরু করে। তারপর ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে নদীর বুক। নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া, মুগারঝোর, মনোহরপুর, পদ্মডুবি, বিলডুমুরিয়া, সোনাপুর, গাওখালী, চাঁদকাঠি, সাচিয়া, লড়া ও পেনাখালীসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য নৌকায় করে নিয়ে আসেন এ হাটে। একইভাবে নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া, গগন, মলুহার, কাঁটাখালী, ইলুহার ও জনতা এবং বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি, উমারেরপাড়, উদয়কাঠী, কদমবাড়ি ও চৌমোহনাসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের কৃষকেরাও এখানে পণ্য বিক্রি করেন।
বাজারে বরবটি, কুমড়া, পুঁইশাক, করলা, পটল, কাঁকরোল, কাঁচকলা, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, শালগম, কচু, চালকুমড়া, নারিকেল, কলা, শাপলা, সবজির চারা ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ব্যাপক সমারোহ ঘটে। কাকডাকা ভোরে ডিঙি নৌকায় কৃষিপণ্যের পসরা সাজিয়ে বাজারে আসেন কৃষকেরা। একই সময়ে ক্রেতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও জড়ো হন।
শুধু কৃষিপণ্য নয়, বাজারটিতে রয়েছে ভাসমান চায়ের দোকান, পিঠা ও বিভিন্ন খাবারের দোকানও। নৌকাতেই এসব দোকানের পসরা সাজিয়ে বিক্রি করেন বিক্রেতারা। ফলে কয়েক ঘণ্টার জন্য বেলুয়া নদী পরিণত হয় মানুষের কোলাহল আর বেচাকেনায় মুখর এক ব্যতিক্রমী বাজারে।
বৈঠাকাটা বাজারে স্থানীয় কৃষকের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররাও আসেন। তারা কৃষিপণ্য কিনে বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলের বাজারে নিয়ে যান। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখানকার কৃষিপণ্যের একটি অংশ দেশের বাইরেও যায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ইউনুস ব্যাপারী বলেন, আমি গ্রাম থেকে মাল কিনে এনে এখানে বিক্রি করি। বেশিরভাগ সময় কাঁকরোল বিক্রি করি। এই বাজারে বেচাকেনা ভালো হয়, দামও ভালো পাই। এখানকার আয় দিয়েই সংসার ভালোভাবে চালাচ্ছি।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি হাটে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার পণ্য কেনাবেচা হয়। তবে মৌসুমভেদে বাজারের চিত্র বদলে যায়। বিশেষ করে তরমুজের মৌসুমে নদীর বুকজুড়ে দেখা যায় তরমুজবোঝাই নৌকার সারি। তখন প্রতি হাটে কেনাবেচার পরিমাণ এক থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছায় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, শনিবার ও মঙ্গলবার ভোরে বাজার শুরু হয়ে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলে। এই বাজারের প্রধান পণ্য কাঁচা সবজি, নারিকেল ও তরমুজ। সব মিলিয়ে ভালো বেচাকেনা হয়। তরমুজের মৌসুমে প্রতিদিন এক থেকে দেড় কোটি টাকার মতো বেচাকেনা হয়। বর্তমানে ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার বেচাকেনা হয়।
বৈঠাকাটা বাজারের আরেকটি বিশেষ দিক হলো ভাসমান কৃষির উপকরণের বেচাকেনা। বেলুয়া নদীতে শুধু শাকসবজি বা ফলমূল নয়, বিক্রি হয় বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও আগাছাও। এসব উদ্ভিদ ব্যবহার করে ভাসমান বেড তৈরি করে শীতকালীন সবজি ও সবজির চারা উৎপাদন করেন স্থানীয় কৃষকেরা।
দক্ষিণাঞ্চলের খাল-বিল ও ছোট নদীবেষ্টিত এলাকায় পানির ওপর ভাসমান বেডে সবজি চাষের প্রচলন দীর্ঘদিনের। কচুরিপানা, তেঁপাপোনা, দুলালিলতা, ফেনাসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ব্যবহার করে তৈরি করা হয় এসব ভাসমান বেড। আগে যেসব উদ্ভিদকে অনেকটা অপ্রয়োজনীয় মনে করা হতো, এখন সেগুলোই কৃষকদের কাছে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বৈঠাকাটা বাজারে শ্যাওলা বিক্রি করতে আসা ইব্রাহিম বলেন, মোল্লারহাট থেকে শ্যাওলা নিয়ে আসি। কুড়ি হিসেবে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করি। বেচাকেনা মোটামুটি ভালো। ভালো দিনে আট-নয় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়, বাজার খারাপ গেলে পাঁচ হাজার টাকার মতো হয়।
শ্যাওলা কিনতে আসা এক ক্রেতা বলেন, ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের জন্য শ্যাওলা কিনতে বাজারে এসেছি। এই শ্যাওলা দিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও চারা উৎপাদন করা হয়।
এ অঞ্চলের ভাসমান কৃষি ও বৈঠাকাটা বাজার যেন একই সূত্রে গাঁথা। পানিতে ডুবে থাকা জমিতে ভাসমান ধাপ তৈরি করে কৃষকেরা সবজি ও চারা উৎপাদন করেন। পরে নৌপথে এসব পণ্য পৌঁছে যায় বৈঠাকাটা বাজারে। অর্থাৎ কৃষি উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পুরো প্রক্রিয়াটিই অনেকটা নদী ও নৌকাকেন্দ্রিক।
বাজারটি ঠিক কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারেন না। স্থানীয়দের ধারণা, বাজারটির বয়স এক শতাব্দীরও কম নয়। তবে প্রবীণ ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে বাজারটির বয়স নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
৪৫ বছর ধরে বৈঠাকাটা বাজারে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, ১৯৭১ সালে আমার জন্ম। এর আগে থেকেই এই হাট ছিল। আমার ধারণা, হাটটির বয়স ৭০ থেকে ৭৫ বছর হবে।
স্থানীয় কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম খান বলেন, যুগ যুগ ধরে এই হাট চলে আসছে। আমার বাবা-দাদার আমল থেকেই এখানে এভাবে বেচাকেনা হতে দেখেছি। এখানে শাকসবজি, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া ও নানা ধরনের কৃষিপণ্য পাওয়া যায়। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরাও এখানে পণ্য কিনতে আসেন।
বয়স নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে সবাই একমত, দীর্ঘদিন ধরে বৈঠাকাটা বাজার এ অঞ্চলের কৃষি ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে টিকে আছে।
বাজারের দিনে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই ব্যতিক্রমী বাজার দেখতে আসেন। নৌকায় সাজানো রকমারি সবজি, নদীর বুকে সারিবদ্ধ নৌকা এবং কয়েক ঘণ্টার জমজমাট বেচাকেনা দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।
বৈঠাকাটা বাজারের অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি রয়েছে পর্যটনের সম্ভাবনাও। দেশের বাইরের বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে মানুষ ঘুরতে আসে। নদীর বুকজুড়ে শত শত নৌকা, কৃষিপণ্যের বেচাকেনা, স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে এটি দক্ষিণাঞ্চলের একটি আকর্ষণীয় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
সম্প্রতি বৈঠাকাটা ভাসমান বাজারকে ঘিরে ভেলা বাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনও হয়েছে। এতে বাজার ও নদীর দুই পাড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ফলে বাজারটি শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্থান নয়, স্থানীয় সংস্কৃতি ও বিনোদনের সঙ্গেও এর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাগর মৃধা বলেন, এই বাজারটি বাংলার ভেনিসখ্যাত একটি বাজার। বিদেশি পর্যটকরাও এখানে ঘুরতে আসেন। তবে রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো নয়, থাকার ব্যবস্থাও নেই। রাস্তাঘাট ও আবাসন সুবিধা উন্নত করা হলে পর্যটকেরা স্বাচ্ছন্দ্যে এখানে ঘুরতে পারবেন।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, নাজিরপুরের বৈঠাকাটা বাজারে নৌকার ওপর বাজার বসে। সেখানে শাকসবজি, ফলমূল, সবজির চারা এবং চারা উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণ বেচাকেনা হয়। শনিবার ও মঙ্গলবার খুব ভোরে বাজার বসে। বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও পাইকাররা এসে এসব পণ্য কেনেন। বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়ে থাকে।
বেলুয়া নদীর ওপর গড়ে ওঠা বৈঠাকাটা ভাসমান বাজার বর্তমানে পাইকারি ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বাজারটিকে ঘিরে কৃষক, পাইকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নৌযানচালকসহ বহু মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও। যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তন ও নৌযান চলাচলের সুযোগ কমে যাওয়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আবাসন ও পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

বাংলাধারা/ডেস্ক

মন্তব্য করুন