প্রকাশিত: ৪ ঘন্টা আগে, ১২:০৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
এক সময় দাখিল মাদরাসার শিক্ষক ছিলেন শামছুল হক ক্বারি। স্থানীয় মসজিদে ইমামতিও করেছেন। টানা ৩৫ বছর শিক্ষার্থীদের দ্বীনি শিক্ষা দিয়েছেন তিনি। মানুষকে কুরআনের আলোয় আলোকিত করার চেষ্টা করেছেন। সমাজে ছিল সম্মান ও পরিচিতি। অথচ জীবনের শেষ সময়ে এসে সেই শামছুল হক ক্বারিই এখন অভাব-অনটন আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। শেরপুরের সদর উপজেলার ধলা ইউনিয়নের চাঁন্দেরনগর মসলিমপাড়া গ্রামে জরাজীর্ণ একটি ঘরে স্ত্রী রেজিয়া বেগমকে নিয়ে বসবাস করছেন ৮৮ বছর বয়সী এই সাবেক শিক্ষক। তার স্ত্রী রেজিয়া বেগমের বয়স ৭৫ বছর। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই দম্পতির মাথার ওপর থাকা শেষ আশ্রয়টিও প্রতিনিয়ত ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে।
জানা যায়, শামছুল হক ক্বারি চাঁন্দেরনগর কোহাকান্দা এম.আর. দাখিল মাদরাসায় টানা ৩৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন। ২০১৩ সালে অবসরে যান তিনি। শিক্ষকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে তার জীবন। অভাব-অনটনের কারণে বহু আগেই বিক্রি হয়ে যায় আবাদি জমি। সম্প্রতি বিক্রি করতে হয়েছে বসতভিটাটিও। বর্তমানে যে ব্যক্তি তার জায়গাটি কিনেছেন, তিনি মানবিক কারণে সেখানে কোনোরকমে বসবাসের সুযোগ দিয়েছেন ওই বৃদ্ধ দম্পতিকে। শামছুল হক ক্বারি ও রেজিয়া বেগমের প্রয়োজন এখন খুব বেশি কিছু নয়—একটি নিরাপদ ঘর, নিয়মিত খাবার আর চিকিৎসার নিশ্চয়তা।
তাদের থাকার ঘরটির অবস্থা এখন করুণ। দুই কক্ষের ঘরের একটি ইতোমধ্যে ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে আছে। অন্য কক্ষটিও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। চালের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়ায় বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর পানি পড়ে। সামান্য বাতাসে কেঁপে ওঠে পুরো ঘর। যেকোনো সময় সেটিও ধসে পড়তে পারে।
এই ঘরেই এক পাশে বসবাস করেন শামছুল হক ও রেজিয়া বেগম। অন্য পাশে মেঝেতে চুলা বসিয়ে রান্না করেন রেজিয়া। রান্নার জায়গা আর থাকার জায়গার মধ্যে নেই তেমন কোনো ব্যবধান। এভাবেই সীমাহীন কষ্টের মধ্যে চলছে তাদের সংসার। খাবারের সংকটও নিত্যসঙ্গী। প্রতিবেশীদের ভাষ্য, অনেক সময় একবেলা খাবার জুটলেও দুইবেলা না খেয়েই দিন পার করতে হয় এই দম্পতিকে।
শামছুল হক ও রেজিয়া বেগমের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। স্থানীয়রা বলছেন, বর্তমানে সন্তানদের সঙ্গে তাদের তেমন কোনো যোগাযোগ নেই।
তবে নিজের সন্তানদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে রাজি নন বৃদ্ধ শামছুল হক ও তার স্ত্রী। সন্তানদের প্রসঙ্গ উঠতেই চোখে জল নিয়ে তারা শুধু বলেন, ‘আল্লাহ তাদের ভালো রাখুন।’
শামছুল হক বলেন, আমি চাঁন্দেরনগর কোহাকান্দা এম.আর. দাখিল মাদরাসায় চাকরি করতাম। ২৭ বছর চাকরি করার পর সরকারি বাজেট আসে, এরপর সরকারি মাদরাসায় চাকরি করেছি। দাখিল থেকে ফাজিল পর্যন্ত পড়িয়েছি। এখনো কালিজিরার সরিষাটাও খালি চোখে দেখতে পারি, চশমা লাগে না। চাকরি শেষ হওয়ার পর ৩০ হাজার টাকা মতো পেয়েছিলাম। আর কোনো টাকা চাকরি শেষ হওয়ার পর পাইনি। সব মিলিয়ে ৩৭ বছর মাদরাসায় চাকরি করেছি।
ছেলে-মেয়েরা খোঁজখবর নেয় কি না জানতে চাইলে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে থাকেন তিনি। অনেকক্ষণ পর ধীর কণ্ঠে বলেন, নেয়ৃ এরপর আর কিছু বলতে পারেননি। ছেলে-মেয়েদের বিষয়ে তিনি জানান, দুই ছেলে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। একজন রিকশা চালান। দুই মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, একজন শিক্ষক, ক্বারি ও ইমাম হিসেবে শামছুল হক ক্বারি এক সময় এলাকায় অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন। জীবনের শেষ সময়ে এসে তার এমন অসহায় অবস্থা আমাদের ব্যথিত করে।
শামছুল হক ক্বারির অবসরকালীন সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে শেরপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রেজওয়ান বলেন, মাদরাসার যেসব শিক্ষক এখনো অবসরকালীন টাকা পাননি, তাদের বিষয়ে গত মাসের শেষ দিকে মাদরাসা অধিদপ্তর থেকে সিদ্ধান্ত এসেছে। যারা টাকা পাননি, তাদের কল্যাণ ও অবসরকালীন সুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে মাদরাসা অধিদপ্তরে আবেদন পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, চাঁন্দেরনগর কোহাকান্দা এম.আর. দাখিল মাদরাসাটি অনেক আগে থেকে এমপিওভুক্ত। শিক্ষক শামছুল হক এমপিওভুক্তির আওতায় ছিলেন কি না, এ বিষয়ে আমার জানা নেই। তিনি যদি এমপিওভুক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে অবসরকালীন ভাতার জন্য আবেদন করতে পারবেন।
শেরপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, শামছুল হক ও তার স্ত্রী দুজনই বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। তারা ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। এর আগে বইয়ের মাধ্যমে ভাতা পেয়ে থাকতে পারেন। তবে অনলাইনে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ভাতা পাওয়ার তথ্য দেখা যাচ্ছে। ওই অর্থবছর থেকে বয়স্ক ভাতা শতভাগ করা হয়েছে।
শেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা বিনতে রফিক বলেন, শামছুল হক ও তার স্ত্রী দুজনই সরকারি ভাতা পাচ্ছেন। তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। আমরা তাদের ঘর মেরামতসহ তাদের জন্য কী করা যায়, সে বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন