বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১১:২১ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

অপার সম্ভাবনার পরেও কেন আন্তর্জাতিক গন্তব্য নয় কক্সবাজার?

ছবি; সংগৃহিত

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ইন্দোনেশিয়ার বালি কিংবা থাইল্যান্ডের পাতায়ার চেয়ে পিছিয়ে নেই কক্সবাজার। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকতের দাবিদার এই পর্যটনশহরে রয়েছে পাহাড়, বন, দ্বীপ, প্রবাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বিমানবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে শত শত হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ। প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটকও আসছেন। এত সম্ভাবনা ও বিনিয়োগের পরও আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি কক্সবাজার।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হয়ে ওঠার জন্য যে ধরনের বৈচিত্র্যময় বিনোদন, মানসম্মত সেবা, নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো প্রয়োজন, তার অনেক কিছুই এখনো অনুপস্থিত। বিদেশি পর্যটকদের জন্য সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, সহজ ভিসাব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত গাইড ও বহুভাষিক তথ্যসেবার ঘাটতি রয়েছে। সৈকতের বাইরে সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকাগুলোও সমন্বিত পর্যটনপণ্যে রূপ নেয়নি। ফলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা সেভাবে তৈরি হচ্ছে না।
আজ রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব পর্যটন দিবস। দিবসটি সামনে রেখে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসায়ী, পরিবেশকর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে আন্তর্জাতিক গন্তব্য হয়ে ওঠার পথে বেশ কয়েকটি প্রতিবন্ধকতার কথা জানা গেছে।
বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে পিছিয়ে কেন কক্সবাজার? 
আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে কক্সবাজারের সম্ভাবনা থাকলেও বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতি এখনো সীমিত। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের ভাষ্য, দুই দশক আগের তুলনায় সমুদ্রসৈকতে বিদেশি পর্যটকদের উপস্থিতি কমেছে। তবে বিদেশি পর্যটকদের আগমনের হালনাগাদ ও পৃথক পরিসংখ্যান সহজলভ্য নয়।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা ঢাকা পোস্টকে বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যগুলোর সঙ্গে কক্সবাজারের বড় পার্থক্য পর্যটনপণ্যের বৈচিত্র্যে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে প্রায় ৭০ লাখ বিদেশি পর্যটক গেছেন। থাইল্যান্ডের পাতায়ায় বছরজুড়ে ম্যারাথন, সংগীত, চলচ্চিত্র, আতশবাজি, জলক্রীড়া, সুস্থতা ও ব্যবসায়িক আয়োজনসহ ৫০টির বেশি বড় ও মাঝারি অনুষ্ঠান হয়। অথচ কক্সবাজারে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ এখনো সমুদ্রসৈকত। অধিকাংশ পর্যটকের ভ্রমণ হোটেল, সৈকত, রেস্তোরাঁ ও বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
আবু মোর্শেদ চৌধুরীর মতে, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করতে হলে সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি বছরজুড়ে সাংস্কৃতিক উৎসব, জলক্রীড়া, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও বিনোদনমূলক আয়োজন চালু করতে হবে।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান বলেন, কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক হোটেল ও রিসোর্ট থাকলেও বিদেশি পর্যটকদের দীর্ঘ সময় ধরে রাখার মতো আয়োজন গড়ে ওঠেনি। পর্যটকদের নিরাপত্তা, হয়রানি এবং অনুমতি ছাড়া ছবি তোলার অভিযোগও রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে কক্সবাজারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো কঠিন।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলেই কি আন্তর্জাতিক গন্তব্য?
কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে বিমানবন্দরের উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। রেল যোগাযোগ চালু হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকদের যাতায়াতও সহজ হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
ট্যুরস অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানের হলেই কক্সবাজার আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠবে না। প্রয়োজন সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, সহজ ভিসাব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসন, প্রশিক্ষিত জনবল, বহুভাষিক তথ্যসেবা, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে ধারাবাহিক প্রচারণা।
তিনি বলেন, বিদেশি পর্যটকদের কাছে কক্সবাজারকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে হবে। শুধু সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য প্রচার করে আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরি করা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক মানের বিনোদনের ঘাটতি
আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যগুলোর অন্যতম আকর্ষণ রাতের বিনোদন। পর্যটকরা দিনের বেলায় বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার পাশাপাশি সন্ধ্যা ও রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত, কেনাকাটা এবং পরিবারবান্ধব বিনোদনে অংশ নেন। কক্সবাজারে এসব সুযোগ এখনো সীমিত।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে সুগন্ধা পয়েন্টের একটি রেস্তোরাঁয় পর্যটকদের জন্য আয়োজিত ডিজে নাইট ঘিরে পুলিশি অভিযান রাতের বিনোদনের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এনেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ সেখানে তল্লাশি চালালেও অভিযোগ অনুযায়ী কোনো কার্যক্রম পায়নি। পরে পাশের কটেজ জোন থেকে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগে ২১ নারী-পুরুষকে আটক করা হয়।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, সারা দিন সমুদ্র ও পাহাড় দেখার পর পর্যটকরা রাতে কোথায় যাবেন, কী করবেন—সেই পরিকল্পনা থাকা দরকার। আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে কক্সবাজারকে গড়ে তুলতে হলে বৈধ, নিরাপদ ও বৈচিত্র্যময় রাতের বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে।
কলিম উল্লেখ করেন, পর্যটনকেন্দ্রের কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মাধ্যমে তা তদন্ত ও নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে অপরাধ দমনের পাশাপাশি আইনসম্মত বিনোদনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
সৈকতের বাইরে নেই আন্তর্জাতিকমানের পর্যটনপণ্য
কক্সবাজার শহরের বাইরে হিমছড়ি, ইনানী, পেচারদ্বীপ, পাটুয়ারটেক, রামু, টেকনাফ, মহেশখালী ও সোনাদিয়ার মতো এলাকায় প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতিনির্ভর পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এসব এলাকাকে আন্তর্জাতিক মানের সমন্বিত পর্যটনপণ্যে রূপ দেওয়া যায়নি।
আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার মতে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কক্সবাজার গন্তব্য উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০২৫–২০২৭-এও এসব এলাকার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরিবহন, আবাসন, নিরাপত্তা, স্যানিটেশন ও পর্যটনসেবার ঘাটতি রয়েছে।
পর্যটন ব্যবসায় জড়িতরা বলছেন, বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে নিরাপদ জলক্রীড়া, ডাইভিং, স্নরকেলিং, কায়াকিং, প্রকৃতিনির্ভর ভ্রমণ, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে প্রশিক্ষিত গাইড ও আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবেশদূষণও বহুজাতিক পর্যটনে বাধা!
আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে একটি গন্তব্যের পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। অথচ কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত ও আশপাশের এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।
পরিবেশকর্মীরা জানান, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য শুধু আধুনিক হোটেল কিংবা বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণ যথেষ্ট নয়। সৈকত ও সামুদ্রিক পরিবেশের সুরক্ষা, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, গত ঈদুল ফিতরের পর মাত্র তিন দিনে সমুদ্রসৈকত থেকে এক টনের বেশি বর্জ্য অপসারণ করতে হয়েছে। কক্সবাজার শহরে প্রতিদিন প্রায় ১৮০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়।
অধিকাংশ হোটেলে কার্যকর পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার না থাকায় অপরিশোধিত বর্জ্যপানি সাগরে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট ও জলাবদ্ধতা বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পর্যটক আছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান কোথায়?
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক কক্সবাজারে আসেন। পর্যটনকে ঘিরে বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। তবে মোট পর্যটকের মধ্যে বিদেশিদের সংখ্যা, তাদের গড় অবস্থানকাল ও ব্যয়ের পৃথক তথ্য ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে কক্সবাজারের প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করা কঠিন।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণের পাশাপাশি তাদের অবস্থানকাল বাড়ানোর পরিকল্পনা প্রয়োজন। পর্যটকরা যত বেশি দিন অবস্থান করবেন, আবাসন, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, হস্তশিল্প ও স্থানীয় সেবা খাতে তত বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি হবে।
এ জন্য আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে কক্সবাজারের ব্র্যান্ডিং, বিদেশি পর্যটন সংস্থা ও ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বছরজুড়ে আন্তর্জাতিক মানের আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
আন্তর্জাতিক গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কক্সবাজারের উন্নয়নে বিভিন্ন সময়ে অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও পর্যটন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়ে গেছে। সৈকত ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা, পরিবহন, বিনোদন ও পর্যটন প্রচারণার দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকায় সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হচ্ছে।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে কক্সবাজারকে গড়ে তুলতে একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এর সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পর্যটন ব্যবসায়ী, পরিবেশকর্মী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে কক্সবাজারের সামনে তাই প্রশ্ন শুধু বছরে কত লাখ পর্যটক আসছেন, তা নয়। আন্তর্জাতিক পর্যটনবাজারে কক্সবাজারের অবস্থান কোথায়, বিদেশি পর্যটকরা কেন এখানে আসবেন, কত দিন থাকবেন এবং কেন আবার ফিরে আসবেন—এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কক্সবাজারকে পরিচিতি দিয়েছে। যোগাযোগ ও আবাসন অবকাঠামোর উন্নয়ন পর্যটক আসার পথ সহজ করেছে।
এখন আন্তর্জাতিক গন্তব্য হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন সেই প্রাকৃতিক সম্পদকে সুরক্ষিত রেখে বৈচিত্র্যময় পর্যটনপণ্য, আন্তর্জাতিক মানের সেবা এবং নিরাপদ ও সমন্বিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাধারা/ডেস্ক

মন্তব্য করুন