প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৭:১৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে প্রথমে শ্রীলঙ্কা ও পরে মিশরে নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করত একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র। চক্রটির অন্যতম মূলহোতা মোহাম্মদ আরজু রহমানকে (৪৭) গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
এসআরবি বলছে, গত ১২ বছর ধরে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত আরজু। এ সময়ে তিনি দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে ইতালি ও ইউরোপে নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রটির হাত থেকে পালিয়ে আসা ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী ইতোমধ্যে এসআরবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৪-এর পদাতিক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান।
তিনি জানান, সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে রাজধানীর বনানীর সি ব্লক এলাকা থেকে এসআরবি-৪ ও এসআরবি-১-এর যৌথ অভিযানে মোহাম্মদ আরজু রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
৮৫ লাখ টাকা নিয়ে শ্রীলঙ্কায়
মো. হাফিজুর রহমান বলেন, চলতি বছরের ১৬ জুলাই মানবপাচারের শিকার কামরুন্নাহার ফাতেমা মিশর থেকে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, একটি মানবপাচার চক্র তাদের ইতালি নেওয়ার কথা বলে মিশরে নিয়ে আটকে রেখেছে।
এরপর এনএসআই গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করে। ওই সময় আরজু মিশরে অবস্থান করছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তাকে নজরদারিতে রাখা হয়। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশে আসার পর তার অবস্থান শনাক্ত করে এসআরবি। বৃহস্পতিবার (আজ) আবার মিশরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। এসআরবি কর্মকর্তা বলেন, কামরুন্নাহার ফাতেমা ও তার পরিবারের পাঁচ সদস্যকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে আরজু তাদের কাছ থেকে ৮৫ লাখ টাকা নেন। পরে ‘বাংলাদেশ থেকে ভিসা হবে না’ বলে তাদের শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়া হয়।
শ্রীলঙ্কায় নির্যাতন
শ্রীলঙ্কায় নেওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয় বলে জানান এসআরবি কর্মকর্তা।
নির্যাতনের একপর্যায়ে পরিবারের তিন ছেলে সদস্য সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দুই মেয়ে কামরুন্নাহার ফাতেমা ও আঞ্জুমান আরা শ্রীলঙ্কায় থেকে যান। পরে আঞ্জুমান আরা পালিয়ে বর্তমানে শ্রীলঙ্কার কোনো একটি স্থানে অবস্থান করছেন বলে জানানো হয়।
কামরুন্নাহার ফাতেমাকে পরে ‘ভিসা হবে না’ বলে শ্রীলঙ্কা থেকে মিশরে নিয়ে যায় চক্রটি।
মিশরে নিয়ে দেহব্যবসায় বাধ্য
এসআরবি কর্মকর্তা বলেন, মিশরে নেওয়ার পর কামরুন্নাহার ফাতেমার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। তাকে অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়। এসব কাজে অস্বীকৃতি জানালে তার ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালানো হয়।
এমনকি তার শরীরের বিভিন্ন অংশে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়ার মতো নির্যাতন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শ্রীলঙ্কা ও মিশর থেকে কামরুন্নাহার ফাতেমা এবং আঞ্জুমান আরা ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে এসআরবি।
জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, আরজু গত ১২ বছর ধরে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। এ সময়ে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে একই ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, আরজুর চক্রের হাত থেকে পালিয়ে আসা ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত এসআরবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায়ও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
লাইসেন্স ছাড়াই ইমিগ্রেশন ব্যবসা
এসআরবি জানায়, আরজুর নিজস্ব কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। তিনি ‘আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ ‘নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড’সহ বিভিন্ন নাম ব্যবহার করে গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে ইউরোপে নেওয়ার প্রলোভন দেখাতেন।
পরে তাদের বিভিন্ন দেশে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়া এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।
আরজুর মোবাইল থেকে পাওয়া একটি ব্যাংক স্টেটমেন্টের বরাত দিয়ে এসআরবি জানায়, গত এক বছরে তার হিসাবে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার বেশি লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
মানবপাচারে ২২৩ গ্রেপ্তার
মানবপাচারবিরোধী অভিযান প্রসঙ্গে এসআরবি কর্মকর্তা বলেন, চক্রগুলোর বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে এসআরবির অভিযানে মানবপাচারের ঘটনায় ২২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার আরজুকে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ভাটারা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তার সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান এসআরবি কর্মকর্তা।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন