প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৩:১১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
লালমনিরহাটের প্রাণ বলে খ্যাত লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক। বুড়িমারী স্থলবন্দরের কারণে ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে দেশের আন্তর্জাতিক ত্রিদেশীয় বাণিজ্যের বেশিরভাগ যানবাহন চলাচল করে এই পথ দিয়ে। প্রতিদিন কয়েক শ ভারী পণ্যবাহী ট্রাকসহ হাজারো যানবাহনের আনাগোনা থাকে এই মহাসড়কে। তবে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই মহাসড়কটি এখন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের কাছে আতঙ্কের নাম। অপ্রশস্ত অবকাঠামো, সংস্কারের নামে অযত্ন এবং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ফোর লেনের প্রতিশ্রুতির কারণে ব্যস্ত এই সড়কটি পরিণত হয়েছে মৃত্যু ফাঁদে।
ক্রমাগত বুড়িমারী স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক পরিধি ও যানবাহনের চাপ বাড়লেও মহাসড়কটির প্রশস্ততা বাড়েনি। ফলে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ও চলতি বছরের এ পর্যন্ত অবহেলিত এই মহাসড়কে দুর্ঘটনায় অন্তত ৪৬ জনের প্রাণ গেছে। হাত-পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে অসহায়ভাবে দিন কাটাচ্ছেন আরও অনেকে, যার পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান নেই। সরু এই সড়কে ভারী যানবাহন, দূরপাল্লার বাস এবং ব্যাটারিচালিত স্থানীয় রিকশা-ইজিবাইকের চলাচলে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ ও ইট উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সংস্কারের নামে কোথাও কোথাও অপরিকল্পিতভাবে ইট ও খোয়া ফেলে রাখায় যানবাহন উল্টে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে আদিতমারী উপজেলার নামুড়ি-পলাশী এবং কালীগঞ্জের ভোটমারী এলাকার কিছু অংশসহ বিভিন্ন স্থানের অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
সড়কের দুর্ভোগের বর্ণনা দিতে গিয়ে আদিতমারীর স্থানীয় বাসিন্দা লাভলু মিয়া বলেন, এই সড়কটি এমনিতেই অনেক সরু, তার ওপর সড়কের বেহাল দশা। রাস্তার ইট-খোয়া বের হয়ে আছে। আবার মেরামতের নামে রাস্তার ওপর ইট ফেলে রাখায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। দিনে অন্তত ৪-৫ হাজার যানবাহন চলাচল করে এই পথে। আমাদের দাবি, সরকার দ্রুত এই সড়কটি ফোর লেনে পরিণত করার উদ্যোগ নিলে আমাদের মনে স্বস্তি আসবে।
জেলার কর্মরত সাংবাদিক খোরশেদ আলম সাগর বলেন, লালমনিরহাটের প্রাণ এই মহাসড়ক দিয়ে জেলার পাঁচটি উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ প্রতিদিন চলাচল করেন। বুড়িমারী স্থলবন্দরের সঙ্গে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পণ্য আনা-নেওয়ার কাজেও সড়কটি ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে শুধু শুনেই আসছি ফোর লেন হবে, কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হয়ে মানুষ মরছে। সীমান্তবর্তী এই অবহেলিত সড়কটিকে নিরাপদ করতে দ্রুত ফোরলেনে উন্নীত করা হোক।
লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কে দুর্ঘটনার মূল কারণ সম্পর্কে লালমনিরহাটের জেলা পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, অপ্রশস্ত সড়কের তুলনায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। এর পাশাপাশি চালকদের বেপরোয়া গতি, পণ্যবাহী যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত ওভারলোডিং এবং মহাসড়কে ধীরগতির থ্রি-হুইলার ও ব্যাটারিচালিত স্থানীয় অটোরিকশা চলাচল পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুলিশ আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
সড়কটির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রসঙ্গে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের লালমনিরহাটের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক বলেন, মহাসড়কের খানাখন্দগুলো নিয়মিত ও রুটিন অনুযায়ী মেরামতের মাধ্যমে যান চলাচলের উপযোগী রাখা হচ্ছে। বুড়িমারী ও মিশন মোড় থেকে সাপটিবাড়ীসহ বাজারসংলগ্ন ব্যস্ত এলাকাগুলোতে সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, স্থায়ী সমাধানের জন্য পুরো মহাসড়কটি ফোর লেনে রূপান্তরের লক্ষ্যে ১১০ ফুট জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক সার্ভে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ডিজাইনের কাজ চলছে। এরপর ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) অনুমোদনের কার্যক্রম শুরু হবে। ভূমি অধিগ্রহণ ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে মূল প্রকল্পের কাজ মাঠে গড়াতে আরও অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে।
লালমনিরহাট জেলা ট্রাক ও ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, লালমনিরহাট থেকে বুড়িমারী পর্যন্ত মহাসড়কটি অনেকটাই সরু। আমরা বারবার দাবি জানিয়ে আসছি, মহাসড়কটি প্রশস্ত করে অন্তত চার লেনে উন্নীত করা হোক। সড়কটি সরু হওয়ায় ট্রাক ওভারটেক করার সময় যানজটের সৃষ্টি হয়। কোথাও কোথাও বড় দুর্ঘটনাও ঘটে।
তিনি আরও বলেন, লালমনিরহাটে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর রয়েছে। ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে এই বন্দর দিয়ে বাণিজ্য পরিচালিত হয়। প্রতিদিন এক হাজারের বেশি ট্রাক এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে। কিন্তু সড়কের সংকীর্ণতা ও বেহাল অবস্থার কারণে ট্রাক চলাচলে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয় এবং অনেক সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তাই সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত এই মহাসড়কটি প্রশস্ত করে ফোর লেনে উন্নীত করা হোক।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের ট্রাফিক শাখার সহকারী পরিচালক মাহমুদুর হাসান বলেন, লালমনিরহাটের এই মহাসড়কটি তুলনামূলকভাবে সরু হওয়ায় প্রায়ই যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় লাগে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সড়কটি প্রশস্ত করে ফোর লেনে উন্নীত করা হলে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন ভুটান থেকে প্রায় ২০০টি ট্রাক এবং ভারত থেকে প্রায় ১৫০টি ট্রাক বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসে। এসব পণ্য বাংলাদেশি ট্রাকের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হয়। কিন্তু সড়কে যানজট থাকায় অনেক সময় একদিনে পণ্য পরিবহন শেষ করা সম্ভব হয় না। সড়কটি প্রশস্ত ও উন্নত হলে ট্রাকগুলো দ্রুত দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পৌঁছে দিতে পারবে। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে এই মহাসড়ক নিয়ে অনেক তোড়জোড় দেখানো হয়েছিল। বাজেট পাস, নকশা ও টেন্ডারের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতি ছিল শূন্য। এখন নতুন করে সড়কটির অ্যালাইনমেন্ট সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘সড়কটি সোজা করতে এবং ফোর লেনে উন্নীত করতে ব্যাপক জমি অধিগ্রহণের জটিলতা দেখা দিয়েছে। তাই সাধারণ মানুষের ক্ষতি যতটা কমানো যায়, অর্থাৎ যতটুকু জমি না নিলেই নয়, ততটুকু অধিগ্রহণ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মহাসড়ক ফোর লেনে রূপান্তরের কাজ শুরু করা হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে অপ্রশস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক। দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে দ্রুত সড়কটি ফোর লেনে উন্নীত করার পাশাপাশি চলমান সংস্কারকাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন