বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৩ ঘন্টা আগে, ১১:১৭ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

কক্সবাজারে বন্যা ও পাহাড়ধসের তাণ্ডব, ৭ দিনে প্রাণ গেল ২৬ জনের; দুর্বিষহ জীবন লাখো মানুষের

ছবি: সংগৃহীত

টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং একের পর এক পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত কক্সবাজার। গত সাত দিনে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি ও পাহাড়ধসের ঘটনায় অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। প্লাবিত হয়েছে শতাধিক গ্রাম, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, সড়ক, কৃষিজমি ও জীবিকা। দুর্যোগের এই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় নৌকাডুবির ঘটনায় প্রাণ হারায় ১২ বছর বয়সী হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা। সে রসুলাবাদ এলাকার আবদুল মালেকের মেয়ে। একই ঘটনায় ঝর্ণার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও তারা বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায় দুই বছর বয়সী শিশু মোহাম্মদ ওয়াকিম। একই দিন সকালে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকায় বন্যার স্রোতে ভেসে প্রাণ হারায় তিন বছর বয়সী শিশু পুষ্প। এছাড়া ভোরে চকরিয়ার মছনিয়া কাটা এলাকায় পাহাড়ধসে একটি বসতঘরের ওপর মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সদর, পেকুয়া, উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় মোট ২৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে ১৫ জনই রোহিঙ্গা শরণার্থী।

দুর্যোগে জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলা। এছাড়া সদর উপজেলা, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাও পানির নিচে চলে গেছে। হাজারো পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে বা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম জানান, বান্দরবান থেকে নেমে আসা ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবেই চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার জানান, শুধু চকরিয়া ও মাতামুহুরীতেই এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। দুর্গতদের জন্য ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য স্লুইস গেটগুলো সচল রাখতে প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ রহমান জানান, সরকারি হিসাবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। এর মধ্যে জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৪ হাজার ৬১ জন।

তিনি আরও জানান, দুর্গত মানুষের সহায়তায় সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুমও চালু রয়েছে।

এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান জানান, শুক্রবার রাত পর্যন্ত গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তিনি জানান, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর-৩ বহাল রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাধারা/শারমিন

 

মন্তব্য করুন