প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৯:৪৭ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বর্ষা মৌসুমের শেষদিকে এসে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। বছরের শুরুতে পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জুন থেকে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। জুলাইয়ে তা আরও তীব্র হয়। আর আগস্টে এসে এক মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় এক হাজার। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও সেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ ডেঙ্গু প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে নতুন করে ৭৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে খালেদা বেগম (৪৭) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয়জনে। মৃতদের মধ্যে তিনজন নারী ও তিনজন পুরুষ।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর চট্টগ্রামে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ১৮৬ জন। এর মধ্যে নগরের ৯৩৬ জন, জেলার বিভিন্ন এলাকার ৯৫৫ জন এবং চট্টগ্রামের বাইরে থেকে এসে চিকিৎসা নেওয়া ২৯৫ জন রয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ১৫১ জন, নারী ৬০২ জন এবং শিশু ৪৩৩ জন।
বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৮৭ জন। চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৪৭ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৩৯ জন।
আগস্টেই অর্ধেকের বেশি আক্রান্ত
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে আগস্টের পরিসংখ্যানে। শুধু ওই এক মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২০২ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন মাত্র এক মাসে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, বছরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকলেও বর্ষা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। জানুয়ারি থেকে মে—এই পাঁচ মাসে চট্টগ্রামে ১৭৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। জুনে এক মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২২ জনে।
জুলাইয়ে সংক্রমণ আরও বাড়তে থাকে। মাসের মাঝামাঝি সময়েই আক্রান্তের সংখ্যা ৪৭২ জনে পৌঁছালে স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করে। এরপর আগস্টে এসে সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এক মাসে ১ হাজার ২০২ জন আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর দ্রুত বিস্তারের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতেও পরিস্থিতির উন্নতির কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ নেই। ১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে গত ২৪ ঘণ্টায় ৭২ জন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য জানানো হয়েছিল। তখন চলতি বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১০৮ জন। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭৮ জন আক্রান্ত হওয়ায় সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৮৬ জনে।
মশক নিধনে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়লেও নগরের বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব কমেনি। নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চালানোর দাবি থাকলেও অনেক এলাকায় এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর অভিযান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত স্থাপনা, ছাদ, বারান্দা ও বিভিন্ন খোলা জায়গায় জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ জন্য মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। বাড়ি, ছাদ, বারান্দা কিংবা আশপাশে যাতে পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
একই সঙ্গে নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত স্থাপনা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণে সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন।
রোগী বাড়ছে, সচেতনতার বিকল্প নেই
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। তবে বর্তমানে ১৮৭ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরও ডেঙ্গুর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একদিকে যেমন মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে, অন্যদিকে জ্বরসহ ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে জ্বরকে সাধারণ মৌসুমি জ্বর ভেবে অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সচেতন হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের ঘরবাড়ি ও আঙিনায় কোথাও যেন পানি জমে মশার বংশবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি না হয়, সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা গেলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের অবশ্যই মশারির ভেতরে রাখতে হবে। কারণ আক্রান্ত রোগীকে মশা কামড়ানোর পর সেই মশার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির শরীরেও ডেঙ্গুর জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে।
চট্টগ্রামে আগস্টজুড়ে ডেঙ্গুর যে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে, সেপ্টেম্বরের শুরুতেও তার গতি থামেনি। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত মশক নিধন, রোগী শনাক্তকরণ এবং জনসচেতনতা—সবগুলো ক্ষেত্রেই সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় বর্ষা-পরবর্তী সময়েও ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন