বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১০:৫০ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

রংপুরে একই পরিবারের ৪ জনকে হত্যা, অন্ধকার বাড়িতে মিলল মরদেহ

ছবি: সংগৃহীত

রংপুর নগরীতে একই পরিবারের চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় দুই থেকে তিন দিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর শনিবার রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষকসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার সময় বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং প্রবেশপথ তালাবদ্ধ ছিল।

নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), তাদের মেয়ে স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দোতলা বাড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে।

নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালার বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকেই তিনি বোন ও তার পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। শনিবার রাতে একে একে বোন, ভগ্নিপতি, ভাগনি ও ভাগনের ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

পূজা বলেন, রাতে স্বামীকে নিয়ে বোনের বাড়িতে গিয়ে দেখেন পুরো বাড়ি অন্ধকার। কলিং বেলও কাজ করছিল না। অনেক ডাকাডাকি করেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি। পরে প্রতিবেশীদের সহায়তায় বাড়ির ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি জানালার থাই গ্লাস খুলে মোবাইলের আলো দিয়ে ভেতরে তাকালে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পান তিনি। এরপর চিৎকার করে প্রতিবেশীদের জানান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা ভেঙে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর দোতলার খাটের নিচ থেকে প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সিঁড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় প্রীতিলতা ও তার মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীর মরদেহ। আর ছাদ থেকে উদ্ধার করা হয় গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলের মরদেহ।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী জানান, নিহতদের গলায় দড়ি ও গামছা প্যাঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্রও তছনছ অবস্থায় পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার অথবা শুক্রবারের কোনো এক সময় হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাটি ডাকাতি হতে পারে, এমন সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী জানান, ঘটনাস্থলের আলামত দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দুই থেকে তিন দিন আগে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। একই সঙ্গে স্বর্ণালংকার বা মূল্যবান জিনিসপত্র রাখা হতে পারে, এমন কয়েকটি জায়গা ভাঙচুরের চিহ্নও পাওয়া গেছে। গামছা বা কাপড় দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার সম্ভাবনাও তারা খতিয়ে দেখছেন।

ঘটনার পর গোয়েন্দা পুলিশ, সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দল ঘটনাস্থলে কাজ করে। তারা বিভিন্ন আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত শুরু করেছে।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) আবদুল মাবুদ জানিয়েছেন, ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও আলামত সংগ্রহের কাজ চলছে। মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ডিবি, সিআইডিসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট সমন্বিতভাবে তদন্ত করছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গণপতি চক্রবর্তী সম্প্রতি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নগরীর মাছুয়াপাড়ার দোতলা বাড়িটিতে বসবাস শুরু করেছিলেন। বাড়িটির নির্মাণকাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। নিচতলা ফাঁকা ছিল এবং নতুন বাসিন্দা হওয়ায় প্রতিবেশীদের সঙ্গেও পরিবারের খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়নি। ফলে কয়েক দিন ধরে বাড়িটি নীরব থাকলেও বিষয়টি সেভাবে কারও নজরে আসেনি।

এদিকে চারজনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। হত্যাকাণ্ডের বিচার ও দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে রংপুর জিলা স্কুল ও কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। ঘটনার পর রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন রংপুর মহানগর বিএনপির নেতারাও।

হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং এটি ডাকাতির ঘটনা কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তেই বেরিয়ে আসবে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার এই নৃশংস ঘটনার রহস্য।

বাংলাধারা/শারমিন

মন্তব্য করুন