প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১০:৪২ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা গত এক দশকে বেড়েছে। সরকারি বাঘ শুমারির তথ্য বলছে, ২০১৫ সালের তুলনায় বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে ১৯টি। তবে বাঘের এই সংখ্যা বৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক হলেও জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট, চোরাশিকার, বন অপরাধ ও মানুষের অনুপ্রবেশের মতো ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে। এসব হুমকি মোকাবিলা করা না গেলে বাঘ সংরক্ষণে সাম্প্রতিক সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বন ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের শুমারিতে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪টিতে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের বাঘ শুমারিতে এ সংখ্যা আরও বেড়ে হয়েছে ১২৫টি। বন কর্মকর্তাদের মতে, শিকারবিরোধী অভিযান, বনাঞ্চলে নজরদারি বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সংরক্ষণ উদ্যোগের ফলে বাঘের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
তবে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন করে তৈরি হচ্ছে নানা চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনে লবণাক্ততা বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর। একই সঙ্গে হরিণ ও বুনো শূকরসহ বাঘের প্রধান খাদ্যপ্রাণীর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। খাদ্যের সন্ধানে অনেক সময় বাঘ লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসছে। এতে মানুষ ও বাঘের সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে।
বন বিভাগের সূত্র বলছে, সুন্দরবনে এখনো সক্রিয় রয়েছে সংঘবদ্ধ চোরাশিকারি চক্র। এসব চক্র ফাঁদ পেতে বাঘ শিকার করে এবং বাঘের চামড়া ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচারের চেষ্টা চালায়।
গত পাঁচ বছরে শিকারিদের হাতে অন্তত ২৫টি বাঘ মারা গেছে। এর মধ্যে ১৯টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বন বিভাগ। গত এক বছরে সুন্দরবনে প্রায় ৪৭৪টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৩৭৭ জন চোরাকারবারি ও বন অপরাধীকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ২৪১টি মামলা হয়েছে। এছাড়া ফাঁদসহ আটক করা হয়েছে আরও ৭০ জনকে।
বাঘের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে সুন্দরবনের শেখেরটেক, কচিখালী এবং ছোট-বড় নদী ও খালের পাশের ঘন ঝোপঝাড় এলাকায় বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। এসব অঞ্চলকে বাঘের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত করে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিকারবিরোধী অভিযানও জোরদার করা হয়েছে।
বন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে বিভিন্ন কারণে সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শিকারি ও পাচারকারীদের হাতে মারা গেছে ২৬টি। খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে গ্রামবাসীর পিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছে ১৮টি। বনদস্যুদের হাতে নিহত হয়েছে আরও ১৮টি বাঘ।
এ ছাড়া বার্ধক্যজনিত কারণে ২১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আইলা ও সিডরের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও অন্তত তিনটি বাঘ মারা গেছে বলে বন বিভাগের তথ্য থেকে জানা যায়।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘ শুধু সুন্দরবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী নয়, বরং পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বনের শীর্ষ শিকারি হিসেবে বাঘ হরিণসহ অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এর ফলে সুন্দরবনের উদ্ভিদ, প্রাণী ও সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
তাই বাঘের অস্তিত্ব রক্ষা মানে শুধু একটি বিপন্ন প্রাণীকে সংরক্ষণ করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুন্দরবনের সামগ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিও।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বনসংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবন বাংলাদেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। বাঘ বেঁচে থাকলে সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যও টিকে থাকবে। আর সুন্দরবনই উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি মানুষের জন্য ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। তাই বাঘ সংরক্ষণ শুধু বন বিভাগের দায়িত্ব নয়, এটি পুরো জাতির দায়িত্ব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঘের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের আবাসস্থল ও খাদ্যপ্রাণী রক্ষায়ও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চোরাশিকার ও বন অপরাধ বন্ধের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সুন্দরবনসংলগ্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
তাদের মতে, এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব হবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যানগ্রোভ বনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন