চট্টগ্রাম বন্দরে নজিরবিহীন অচলাবস্থা, থমকে গেছে আমদানি-রপ্তানি
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০২৬, ০৮:৩৪ রাত
ছবি: সংগৃহিত
চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার কর্মবিরতি ও জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নজিরবিহীন অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতিকে ‘মহাবিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি বৈঠক শেষে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে দেশের শীর্ষ ১০টি ব্যবসায়ী সংগঠন, এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন, বিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বিটিটিএলএমইএ, বিজিএপিএমইএ ও বিজিবিএ, একযোগে স্বাক্ষর করে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এই প্রথম জাহাজ চলাচল পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। জাতীয় অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তারা জানান, বন্দর এক দিন বন্ধ থাকলেই অর্থনীতিতে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ক্ষতি হয়। চলমান অচলাবস্থার কারণে তৈরি পোশাকসহ সব রপ্তানিমুখী শিল্পের আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে, যা দেশকে অপূরণীয় ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, একদিকে শিল্পকারখানায় কাঁচামাল সময়মতো পৌঁছাচ্ছে না, অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্য বন্দরে আটকে থাকায় শিপমেন্ট মারাত্মকভাবে বিলম্বিত হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দেওয়া নির্ধারিত সময়সীমা (ডেডলাইন) রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বড় অঙ্কের ক্রয়াদেশ বাতিলের পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে সোর্সিং প্রত্যাহারের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ব্যবসায়ী নেতারা আরও বলেন, বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি খাত চরম চাপের মধ্যে রয়েছে। উদ্যোক্তারা প্রাণান্তকর চেষ্টা করে শিল্প টিকিয়ে রাখছেন। এর মধ্যে বন্দরের অচলাবস্থার ফলে ভয়াবহ কনটেইনার জট তৈরি হয়েছে।
এই জটের কারণে ডেমারেজ চার্জ, পোর্ট চার্জ ও স্টোরেজ ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমিয়ে দেবে। একই সঙ্গে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাব আমদানিকৃত পণ্যের দামেও পড়বে।
সামনে পবিত্র রমজান মাস উল্লেখ করে বিবৃতিতে সতর্ক করে বলা হয়, সংকট দ্রুত সমাধান না হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজারে পৌঁছাতে দেরি হবে। এতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়ে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
নেতারা বলেন, শিপমেন্ট বিলম্বের কারণে ব্যাংকঋণ ও এলসি ব্যবস্থাপনায়ও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সময়মতো দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে আর্থিক খাতে ঝুঁকি তৈরি হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে, যার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে।
বিবৃতিতে সরকারকে উদ্দেশ করে বলা হয়, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই মুহূর্তেই সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এনসিটি ইজারা সংক্রান্ত যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নতুন সরকার চাইলে পুনরায় পর্যালোচনা করতে পারে। তবে সে অজুহাতে দেশের প্রধান বন্দর অচল রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
একই সঙ্গে বন্দরের শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর প্রতিও আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, আপনারাই এই বন্দরের প্রাণ। দাবি-দাওয়া জানানোর অধিকার আপনাদের রয়েছে, কিন্তু জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া মানে দেশের অর্থনীতি ও নিজেদের ভবিষ্যৎকেই ঝুঁকির মুখে ফেলা। এই মুহূর্তে বন্দর সচল করাই হবে সবচেয়ে বড় দেশপ্রেম।
বিবৃতির শেষাংশে ব্যবসায়ী নেতারা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার ও আন্দোলনরত পক্ষগুলো অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে বসে একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছাবে। অন্যথায় এই মহাবিপর্যয় থেকে উত্তরণ কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না।
বাংলাধারা/এসআর
