প্রকাশিত: ১৮ ঘন্টা আগে, ১০:৫৬ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে পারেন- জাতীয় রাজনীতিতে এমন আলোচনা এখন তুঙ্গে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে জোর গুঞ্জন, আজ শুক্রবারই তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন। এ আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের হঠাৎ বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে আজই দেশে ফেরার খবরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই ব্যাংকক গিয়েছিলেন স্পিকার। তার আগামী ২৬ জুলাই দেশে ফেরার কথা থাকলেও সফর সংক্ষিপ্ত করে শুক্রবার দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সংসদ সচিবালয়ের একটি সূত্রও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
রাজনৈতিক মহলের অনেকের ধারণা, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই স্পিকারের এই আকস্মিক প্রত্যাবর্তন। কারণ, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকারই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের বিষয়ে বিএনপির উচ্চপর্যায় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ফলে তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব ছাড়তে পারেন- এমন আলোচনা দিন দিন জোরালো হচ্ছে।
এমনও জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনের কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। দায়িত্ব ছাড়ার পর তিনি কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে পারেন কিংবা চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারেন বলেও আলোচনা রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে চারজন প্রবীণ নেতার নাম। তারা হলেন-
* বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
* স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন
* স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান
* স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান
এ ছাড়া প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা একজন চুক্তিভিত্তিক সচিবের নামও আলোচনায় এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এর পেছনে কয়েকটি কারণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রথমত, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ওঠেনি। পরিচ্ছন্ন ও সাদামাটা ভাবমূর্তি তাকে দলীয় গণ্ডির বাইরেও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপির কঠিন রাজনৈতিক সংকটে দলের নেতৃত্ব ধরে রাখা, অসংখ্য মামলা ও কারাবরণ সত্ত্বেও সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং জিয়া পরিবারের প্রতি তার দীর্ঘদিনের আনুগত্য তাকে দলের সর্বস্তরে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদে এমন একটি গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বকে দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে মত বাড়ছে।
১৯৪৮ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কর্মজীবনে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জনের পর সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন। ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচনায় থাকা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিএনপির অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এই রাজনীতিক বিভিন্ন সময়ে স্বরাষ্ট্র, জ্বালানি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ড. আব্দুল মঈন খানও বিএনপির একজন প্রবীণ নেতা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। বিএনপি সরকারের সময়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী এবং বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
নজরুল ইসলাম খান দীর্ঘদিন শ্রমিক রাজনীতি এবং বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। তিনি কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বর্তমানে সরকারের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন।
৫৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
এ ছাড়া সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল যার মনোনয়ন দেবে, তার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিল মাসে।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, রাজনৈতিক পালাবদল এবং অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে যায়। সেই পরিবর্তিত বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির পদ নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
বর্তমানে রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগ, স্পিকারের আকস্মিক দেশে ফেরা এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন- সব মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি, বঙ্গভবন কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন