বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ০২:৫১ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

দিনভর রাস্তায় থেকেও চালকের পকেট ফাঁকা!

ছবি; সংগৃহিত

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তারা সড়কেই থাকেন। একজন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পুরোনো প্রাইভেটকার কিনে রাইড শেয়ারিং করেন, অন্যজন ভাড়ায় চালান সিএনজিচালিত অটোরিকশা। রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে দুজনের আয়ের ধরন আলাদা হলেও বর্তমান সংকট একই। গাড়ি চালিয়ে আয় করার সময়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে জ্বালানি ‘কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস’ (সিএনজি) সংগ্রহের লাইনে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র যানজট, বাড়তি খরচ ও প্রতিদিনের জমার টাকা। ফলে দিনভর রাস্তায় থেকেও খরচের টাকাই জোগাড় করতে পারছেন না চালকেরা। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে একটি পুরোনো প্রাইভেটকার কিনেছেন আব্দুল আলী। প্রতি মাসে ব্যাংকের কিস্তি দিতে হয় ৩৫ হাজার টাকা। মাসে ২৫ দিন গাড়ি চালানোর হিসাবে প্রতিদিন শুধু কিস্তির জন্যই তাকে ১ হাজার ৪০০ টাকা জমা করতে হয়। এর বাইরে গাড়ি রাস্তায় নামালেই গ্যাস ও খাবারসহ প্রতিদিন অন্তত আড়াই হাজার টাকা খরচ। এরপর যা থাকে, সেটিই তার নিট আয়। বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মে গাড়ি চালিয়েই এই টাকা জোগাড় করেন তিনি।
কিন্তু আব্দুল আলীর সেই হিসাব এখন আর মিলছে না। গাড়ির জন্য গ্যাস সংগ্রহ করতেই দিনের অর্ধেক সময় চলে যাচ্ছে। এরপর রয়েছে ঢাকার চিরচেনা যানজট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিদিনের ন্যূনতম খরচের টাকা আয় করাই এখন তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আব্দুল আলীর চেয়েও বেশি সংকটে পড়েছেন ঢাকায় আট বছর ধরে অটোরিকশা চালানো ওবায়দুল। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অটোরিকশা চালানোর জন্য মালিককে প্রতিদিন ধোয়ামোছাসহ ১ হাজার ২০০ টাকা জমা দিতে হয়। সারাদিনের গ্যাসে খরচ হয় প্রায় ৪০০ টাকা, আর খাবারের পেছনে গড়ে আরও ৪০০ টাকা। অর্থাৎ বাড়িতে কিছু টাকা নিয়ে ফিরতে হলে প্রতিদিন অন্তত ২ হাজার টাকার বেশি আয় করতেই হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে সিএনজি সংকট তীব্র হওয়ায় সেই হিসাবও এলোমেলো হয়ে গেছে। দিনে অন্তত দুবার ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে ওবায়দুলকে। প্রতিবার প্রায় তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ৮০ থেকে ১০০ টাকার গ্যাস পাচ্ছেন। অর্থাৎ ১৪ ঘণ্টার কর্মদিবসের মধ্যে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টাই চলে যাচ্ছে যাত্রী পরিবহনের বাইরে।
এতে শুধু আয়ই কমছে না, অনেক দিন জমার টাকাও উঠছে না। গত সাত দিনের মধ্যে পাঁচ দিনই নিজের জমানো টাকা থেকে অটোরিকশার মালিকের জমা মেটাতে হয়েছে তাকে। আর মাত্র দুদিন সব খরচ মিটিয়ে প্রায় ১ হাজার টাকা করে বাড়িতে নিয়ে যেতে পেরেছেন। যে মানুষটি প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা সড়কে থাকেন, তার জন্য খরচের টাকা তোলাই এখন দায়। এটি কেবল আব্দুল আলী কিংবা ওবায়দুলের গল্প নয়, রাজধানীর অধিকাংশ গ্যাসচালিত যানবাহনের চালকের একই দশা। গত রোববার (১৬ আগস্ট) সকালে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে থাকা একাধিক চালকের সঙ্গে কথা বলে একই তথ্য জানা গেছে। প্রাইভেটকার চালক রাশেদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আগে সারাদিন গাড়ি চালিয়ে সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা আয় হতো। সেখান থেকে আড়াই হাজার টাকা খরচ বাদ দিয়ে ৩ হাজার টাকার মতো বাসায় নিয়ে ফিরতাম। কিন্তু এখন দিনে ২-৩টি ট্রিপ দেওয়ার পরই আবার গ্যাসের লাইনে দাঁড়াতে হয়। তাই ছোট ট্রিপ ছাড়া ধরি না। সারা দিনে বড়জোর ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকার ট্রিপ মারতে পারছি।’
সিএনজি অটোরিকশার চালক শেখ মাহবুব রব্বানী বলেন, ‘আমাদের দিন কেটে যাচ্ছে লাইনে দাঁড়িয়ে। সিলিন্ডারে সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার গ্যাস ভরতে পারলে সারাদিন চালানো যায়। কিন্তু পাম্পে পাই মাত্র ৮০-১০০ টাকার গ্যাস। ১৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৭ ঘণ্টা ট্রিপ মেরে জমার টাকা ও খরচ উঠানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। বর্তমানে অনেক কষ্টে আছি। জানি না এভাবে আর কত দিন চলতে হবে!’ বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব মো. গোলাপ হোসেন সিদ্দিকী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘গ্যাসের জন্য পাম্পে ৪-৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে চালকদের কাজের সময় কমে গেলেও মালিকের দৈনিক জমার টাকায় কোনো ছাড় মিলছে না। এখনও অনেক মালিক প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত জমা নিচ্ছেন।’
দৈনিক জমা কিছুটা সহনীয় করার আহ্বান
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান ১৬ আগস্ট দুপুরে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধানে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকে এগোতে হবে। কয়েক মাস আগে জ্বালানি তেলের সংকটে যারা সরাসরি তেলের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, তারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন গ্যাস সংকটের কারণে যারা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাস থাকলে গাড়ির চাকা ঘুরবে, আর চাকা ঘুরলেই চালকদের জীবিকার সংস্থান হবে। নতুন সরকারের পক্ষে এই সংকট রাতারাতি সমাধান করা কঠিন, কারণ তাদের আগের বকেয়া সংকট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির উচ্চমূল্যের চাপ সামলাতে হচ্ছে।’
গ্যাসের জন্য পাম্পে ৪-৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে চালকদের কাজের সময় কমে গেলেও মালিকের দৈনিক জমার টাকায় কোনো ছাড় মিলছে না। এখনও অনেক মালিক প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত জমা নিচ্ছেনমো. গোলাপ হোসেন সিদ্দিকী, সদস্য সচিব, ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদ
চালকদের মানবিক দিক বিবেচনা করে তিনি আরও বলেন, ‘রাইড শেয়ারিং ও অটোরিকশার চালকেরা দিনে ৭-৮ ঘণ্টা গ্যাসের লাইনে বসে থাকছেন, ফলে তাদের কর্মক্ষম সময় নষ্ট হচ্ছে। এই আপৎকালীন সময়ে গাড়ির মালিকদের উচিত দৈনিক জমার টাকা কিছুটা কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনা। এতে সংকটকালীন সময়ে চালকদের ওপর মানসিক ও আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে।
জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় দেশের চলমান গ্যাস সংকটে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। পেট্রোবাংলার জনসংযোগ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ আগস্ট জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২৮ মিলিয়ন ঘনফুটে (এমএমসিএফডি)। ওই দিন দেশীয় উৎসের গ্যাসসহ মোট সরবরাহ হয়েছে ২ হাজার ৪৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট, যা গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, সামিটের এফএসআরইউ থেকে ৫১০ মিলিয়ন এবং এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ থেকে ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। একই সময়ে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া গেছে ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। উল্লেখ্য, গত ২১ জুলাই মহেশখালী উপকূলে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে যান্ত্রিক গোলযোগের পর জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। এতে সারা দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে তীব্র সংকট দেখা দেয়। পেট্রোবাংলার দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৩-১৪ আগস্ট ৩ হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল মাত্র ১ হাজার ৯৩১ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনফুট। এর আগের তিন দিনও সরবরাহ ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ৩৯ দশমিক ২, ২ হাজার ১০৯ দশমিক ৬ এবং ২ হাজার ১৯৯ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট। সেই তুলনায় ২ হাজার ৪৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ সাম্প্রতিক সময়ের গ্যাস পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এদিকে, গত ১৬ আগস্ট হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক সেমিনারে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট আমরা অতীত থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। তবে স্বীকার করতেই হবে, এই সংকটের দ্রুত কোনো সমাধান সম্ভব নয়। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য অন্তত ২ বছর সময় লাগবে। সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এর আগে ১৩ আগস্ট সিপিডি আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, এফএসআরইউর প্রকৌশলীদের কাজ শেষ হওয়া ছাড়া আপাতত আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে লোডশেডিং কম রাখা এবং শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার কার্যকর ব্যবস্থাপনা তৈরি করা।
সংকট নিরসনে সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী আরও বলেন, আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। তবে এফএসআরইউ সচল না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে গ্যাস উত্তোলনের সাময়িক পথ সীমিত।

বাংলাধারা/ডেস্ক

মন্তব্য করুন