প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১০:০৪ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৭ জনে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও অন্তত ৪০৩ জন। নিখোঁজদের বড় একটি অংশ বিদেশি পর্যটক। ২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর এটিকে দেশটির অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকালে দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় বাগমাতি প্রদেশের রসুয়া ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় আকস্মিক বন্যা ও ব্যাপক ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এর মাত্র তিন মিনিট আগে তিব্বত অঞ্চলে ভূমিকম্প হয়েছিল বলে জানিয়েছে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল। তবে ভূমিকম্পের সঙ্গে পরবর্তী বন্যা ও ভূমিধসের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নেপালের পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর মাত্র তিন মিনিট পর, সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। বিষয়টি আরও যাচাই করে দেখা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত দুর্যোগকবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রসুয়ায় একজন, নুয়াকোটে ১১, ধাদিংয়ে ১৮, চিতওয়ানে ৩৩, গোর্খায় ১৯, তানাহুঁতে ৭ এবং নওয়ালপুরে ১১ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নিখোঁজদের নিয়ে। নেপাল পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজ ৪০৩ জনের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক এবং ৬১ জন নেপালি। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতের ১৩৩, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ২৬টি দেশের নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২০০ জন নারী ও ২০৩ জন পুরুষ।
ট্যুর অপারেটরদের বরাত দিয়ে পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, নিখোঁজদের অধিকাংশই ভারত ও নেপালের সীমান্তবর্তী মানস সরোবরের উদ্দেশে যাত্রা করছিলেন। ফলে পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে দুর্যোগের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতা উঠে এসেছে স্থানীয়দের বর্ণনাতেও। স্থানীয় বাসিন্দা ৫৬ বছর বয়সী রাজু ভাদেল জানান, সকালে তার ভগ্নিপতি ফোন করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাদের পুরো বাড়ি বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়ার কথা জানান। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা গেলেও তার এক ভাই এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপাল পুলিশের প্রকাশ করা ছবি ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দুর্যোগের ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। প্রবল স্রোতে নদীর তীরবর্তী বাড়িঘর ভেসে যাচ্ছে। কোথাও আবার কাদামাটির নিচে চাপা পড়া বাড়ির শুধু ওপরের অংশ দৃশ্যমান রয়েছে।
দুর্যোগে দেশটির বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ মিলিয়ে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় পুলিশের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, এখনো ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি। নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার ও উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করেছে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়াদের উদ্ধারে বিমান ও স্থলপথে অভিযান চালানো হচ্ছে।
এদিকে নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বত অঞ্চলও এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের গিরং এলাকায় আকস্মিক বন্যায় অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ২৬৫ জন। নেপাল সীমান্তবর্তী একটি বাণিজ্যকেন্দ্রে ভূমিধসে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলেও জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। দুই দেশের সীমান্তবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে একসঙ্গে বন্যা, ভূমিধস ও ভূমিকম্পের প্রভাবে উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ ও ভূমিকম্পের সঙ্গে আকস্মিক বন্যা-ভূমিধসের সম্ভাব্য সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে বিপুল প্রাণহানি, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা এবং অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিতে নেপালে তৈরি হয়েছে গভীর মানবিক সংকট।
সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট ও বিবিসি
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন