প্রকাশিত: ৪ ঘন্টা আগে, ০১:০৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও পটিয়া উপজেলার বিস্তৃত পাহাড়ি এলাকায় উৎপাদিত ঐতিহ্যবাহী ‘কাঞ্চন পেয়ারা’ বাজারে আসতে শুরু করেছে। দুই উপজেলার প্রায় ৮৩০ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে এ বছর পেয়ারা চাষ হয়েছে। প্রতি মৌসুমে কৃষকরা গড়ে ৬ কোটি টাকার বেশি পেয়ারা বিক্রি করেন। অতুলনীয় স্বাদ, আকর্ষণীয় রং, ফলের গড়ন ও দীর্ঘ সময় সতেজ থাকার কারণে এই পেয়ারা এখন বিদেশের বাজারেও জায়গা করে নিয়েছে।
আগস্টের শুরু থেকেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় কাঞ্চন পেয়ারা বিক্রি হচ্ছে। বাম্পার ফলনে চাষিরা এখন বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ ও ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রিতে ব্যস্ত। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকে পেয়ারা সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার ও কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে চন্দনাইশ-পটিয়ার এই পেয়ারা। এতে কৃষকের মুখে যেমন হাসি ফুটেছে, তেমনি দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে।
ফল ও সবজি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ফুডস অ্যান্ড ভেজিটেবলস-এর স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইসমাইল চৌধুরী হানিফ জানান, কাঞ্চন পেয়ারার বিদেশে চাহিদা বাড়লেও রপ্তানি প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রায় ১০-১৫ বছর ধরে কাঞ্চন পেয়ারা বিদেশে যাচ্ছে। বছরে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকার কাঞ্চন পেয়ারা ও অন্যান্য জাতের পেয়ারা রপ্তানি হয়। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং, সংরক্ষণ সুবিধা ও কোল্ড চেইন অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে রপ্তানি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুনা সাহা বলেন, “কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়লে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও কৃষকের আয় বাড়বে।”
কৃষি অফিস ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাঞ্চন পেয়ারা বদলে দিয়েছে কয়েক হাজার চাষির জীবন। চন্দনাইশের কাঞ্চননগর ছাড়াও ধোপাছড়ি, হাশিমপুর, জঙ্গল হাশিমপুর, এলাহাবাদ, দোহাজারী, জঙ্গল জামিজুরীসহ বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলের প্রায় ৭৫০ হেক্টর জমিতে দুই হাজার বাগানে পেয়ারা চাষ হয়েছে। পটিয়ার শ্রীমাই, খরনা ও হাইদগাঁও পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ৮০ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়েছে। কোনো প্রকার কীটনাশক ছাড়াই চাষ হওয়ায় এ পেয়ারা অর্গানিক হিসেবেও পরিচিত।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, কাঞ্চন পেয়ারা পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ, স্বাদে অনন্য, মিষ্টি ও আকর্ষণীয়। ভেতরে শক্ত বিচি কম থাকে এবং পাকলে সাদা, হলুদ কিংবা লালচে রঙ ধারণ করে। চন্দনাইশের কাঞ্চননগর গ্রামে প্রথম এ জাতের চাষ শুরু হওয়ায় এর নাম হয়েছে ‘কাঞ্চন পেয়ারা’।
কৃষক জানে আলম বলেন, “প্রায় ৮ একর জমিতে পেয়ারা চাষ করেছি। মৌসুমের শুরুতে এক জোড়া ঝুড়ি পেয়ারা ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে মাঝামাঝি সময়ে দাম কমতে শুরু করে।” কৃষক সগীর আহমেদ জানান, “এক একর জমিতে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করা যায়। তবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না।”
পটিয়ার খরনা গ্রামের কৃষক রবিউল হোসেন বলেন, “এক সময় জুমচাষ হতো, এখন সেখানে পেয়ারা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন হিমাগার নির্মাণের কথা বললেও অগ্রগতি নেই।”
চন্দনাইশের বিভিন্ন স্থানে মৌসুমে অস্থায়ী বাজার বসে, যেখানে পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকে পেয়ারা কিনে নেন।
চন্দনাইশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আজাদ হোসেন জানান, “কৃষি অফিস নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে থাকে। জ্যাম-জেলি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করে, কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবেন।” তিনি বলেন, চন্দনাইশ ও পটিয়ায় উৎপাদিত পেয়ারার বাজারমূল্য প্রতি মৌসুমে ৬ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
পটিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, “উপজেলায় প্রায় ৮০ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে পেয়ারা চাষ হয়েছে। এ বছর ফলন ভালো হলেও অতিরিক্ত বৃষ্টিতে কিছু গাছ নষ্ট হয়েছে। তবে কৃষকরা এবার ভালো দাম পাচ্ছেন।”
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন