প্রকাশিত: ৬ ঘন্টা আগে, ১০:৫৮ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
জীবিকার তাগিদে একসময় গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে ছুটে বেড়াতেন মিজানুর রহমান। সারাদিনের ব্যস্ততার পরও মনে ছিল নিজের কিছু করার স্বপ্ন। শুধু নিজের ভাগ্য বদল নয়, এলাকার মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ইচ্ছাও ছিল তার। সেই স্বপ্ন থেকেই ২০২১ সালে শুরু করেন মিশ্র ফলের চাষ। শুরুতে ছিল নানা সীমাবদ্ধতা, ছিল অভিজ্ঞতার ঘাটতিও। তবে ধৈর্য, পরিশ্রম আর কৃষির প্রতি ভালোবাসায় ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন তিনটি ফলের বাগান। এখন আড়াই বিঘা জমিতে নানা জাতের ফলের সমারোহ, সঙ্গে রয়েছে উন্নত জাতের ফলের চারা বিক্রির উদ্যোগও।মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের ছোট কলধারী গ্রামের মো. মিজানুর রহমান পেশায় একজন গাড়িচালক। এর পাশাপাশি কৃষিকাজকে নিজের স্বপ্ন ও আয়ের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। নিজের উদ্যোগ ও শ্রমে গড়ে তুলেছেন তিনটি মিশ্র ফলের বাগান।
বাগানে একইসঙ্গে চাষ হচ্ছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফল। ভিয়েতনামি মাল্টা, ১২ মাসি মাল্টা, মাল্টা পয়সা বারি-১, বাউ-৩ ভিয়েতনামি জাত, চায়না ও দার্জিলিং কমলা, বেদানা বারি-৪ ও বারি-৭, পেঁপে এবং বিভিন্ন জাতের লেবুসহ নানা ধরনের ফল রয়েছে বাগানে।
ইতোমধ্যে বেশ কিছু গাছে এসেছে ফল। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলে থাকা মাল্টা, কমলা, বেদানা ও অন্যান্য ফল যেন মিজানুর রহমানের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমেরই প্রতিচ্ছবি। ফলন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাজারেও এসব ফলের চাহিদা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় ফলের বাগান, বিভিন্ন হাট-বাজার ও বড় মোকামে বিক্রি হচ্ছে তার বাগানের ফল।
শুধু ফল উৎপাদনেই থেমে থাকেননি মিজানুর রহমান। বিভিন্ন উন্নত জাতের ফলের চারা উৎপাদন ও বিক্রিও করছেন তিনি। এতে একদিকে যেমন নিজের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে আশপাশের কৃষকরাও উন্নত জাতের ফলের চারা সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছেন।
মিজানুর রহমান বলেন, মানুষের ফলের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিজের জীবিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ফলের বাগান করার উদ্যোগ নিয়েছি। শুরুতে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। নতুন নতুন জাতের ফল সম্পর্কে জানতে হয়েছে, গাছের পরিচর্যা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ নিয়েও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়েছে। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বাগান বড় করেছি।
তিনি আরও বলেন, নিজের উদ্যোগে কিছু করার ইচ্ছা থেকেই ফলের বাগান শুরু করি। এখন বাগানে বিভিন্ন জাতের ফল হচ্ছে। ফলের পাশাপাশি উন্নত জাতের চারাও বিক্রি করছি। মানুষের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বাগান করার ইচ্ছা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মিজানুর রহমানের উদ্যোগটি এলাকায় বেশ আগ্রহ তৈরি করেছে। পেশায় গাড়িচালক হয়েও তিনি অবসর সময়ে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। নিজের শ্রম ও উদ্যোগে বাগান গড়ে তুলে তিনি অন্যদেরও কৃষিকাজে আগ্রহী করে তুলছেন।
করিম নামে স্থানীয় এক কৃষক বলেন, আগে আমরা ভাবতাম ভালো ফলন পেতে বড় জমি ও অনেক টাকা দরকার। কিন্তু মিজানুর রহমানের বাগান দেখে বোঝা যাচ্ছে পরিকল্পনা করে বিভিন্ন জাতের ফল চাষ করেও ভালো কিছু করা সম্ভব। তার কাছ থেকে অনেকেই ফলের চারা সংগ্রহ করছেন এবং নতুন করে বাগান করার ব্যাপারে আগ্রহী হচ্ছেন।
মহম্মদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইশরাত জাহান শিলু বলেন, মিজানুর রহমানের এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি একজন গাড়িচালক হয়েও মিশ্র ফলের বাগান করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন এবং কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। এ ধরনের উদ্যোগ আরও বেশি মানুষকে কৃষির প্রতি আগ্রহী করবে।
তিনি আরও বলেন, কৃষিতে এ ধরনের উদ্যোগ বাড়লে একদিকে যেমন স্থানীয়ভাবে ফলের চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও ফলের বাগান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিকল্পনা ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে মিজানুর রহমানের মতো উদ্যোক্তারা আরও এগিয়ে যেতে পারেন।
কৃষির প্রতি আগ্রহী তরুণদের জন্য মিজানুর রহমানের উদ্যোগটি হতে পারে অনুপ্রেরণার উদাহরণ। তার দেখানো পথ যেন বলে দেয়, শুধু চাকরি বা প্রচলিত পেশার ওপর নির্ভর না করে পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও ধৈর্য নিয়ে কৃষিতেও গড়ে তোলা যায় সফলতার নতুন পথ।
একসময় জীবিকার প্রয়োজনে যে হাতে ছিল গাড়ির স্টিয়ারিং, এখন সেই হাতেই তিনি পরিচর্যা করছেন নানা জাতের ফলের গাছ। গাছের ডালে ঝুলে থাকা প্রতিটি ফল যেন তার দীর্ঘদিনের শ্রম, স্বপ্ন ও অধ্যবসায়ের প্রতিচ্ছবি। ছোট কলধারীর এই মিশ্র ফলের বাগান তাই শুধু একটি কৃষি উদ্যোগ নয়—এটি বদলে যাওয়ার, অন্যকে বদলে দেওয়ার এবং নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক জীবন্ত গল্প।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন