প্রকাশিত: ২০ ঘন্টা আগে, ০৮:৪২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
দেশের অন্যতম বৃহৎ পানি অবকাঠামো প্রকল্প ‘পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, সেচ, নদী পুনরুদ্ধার ও লবণাক্ততা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। গত ২৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাসান মাহমুদকে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশ অনুযায়ী, ফেনী পানি উন্নয়ন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পালন করবেন। তবে নিয়োগের পরই প্রশ্ন উঠেছে এত বড় প্রকল্পের নেতৃত্বে তাঁকেই কেন? সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পের অনুমোদিত জনবল কাঠামোতে পিডির পদ দ্বিতীয় বা তৃতীয় গ্রেডের জন্য নির্ধারিত। অথচ হাসান মাহমুদ বর্তমানে চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা। বাপাউবোর সিভিল ক্যাডারের জ্যেষ্ঠতা তালিকায় তাঁর অবস্থান ৬২ বলেও দাবি করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ ৬১ জন কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে কোন প্রশাসনিক যুক্তি ও বিধানের ভিত্তিতে তাঁকে এত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলো। এ বিষয়ে প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি, জনবল কাঠামো, নিয়োগসংক্রান্ত নোটশিট ও সুপারিশ প্রকাশের দাবি উঠেছে। হাসান মাহমুদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাপাউবো বঙ্গবন্ধু পরিষদের ২০২২-২০২৪ মেয়াদের কমিটিতে তাঁর নাম নির্বাহী সদস্য হিসেবে থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে হাসান মাহমুদ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এছাড়া ২০০৭ সালে বাপাউবোর সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে তাঁর নিয়োগ পরীক্ষার মেধাক্রম ও কোটা-সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ পরীক্ষার মেধাতালিকা ও সরকারি নথি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বগুড়া পানি উন্নয়ন বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জঋছ ও উচগ-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ওই সময়ের কার্যাদেশ, দরপত্র নথি, কাজের মূল্য ও বিল পরিশোধের রেকর্ড পর্যালোচনা প্রয়োজন। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভোলার চরফ্যাশনে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। এমনকি কমিশন আদায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত বা প্রামাণ্য নথি প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন। হাসান মাহমুদের পিডি নিয়োগের নেপথ্যে প্রভাবশালী মহলের সুপারিশের গুঞ্জন রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকার কথা বলা হচ্ছে। তবে এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। এ অবস্থায় মূল প্রশ্ন—হাসান মাহমুদের নাম কে প্রস্তাব করেছিলেন, কোন দপ্তর সুপারিশ করেছিল, কোন নোটশিটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং চতুর্থ গ্রেডের একজন কর্মকর্তাকে কী যুক্তিতে এত বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলো? বিতর্কের অবসানে সংশ্লিষ্ট মহল পদ্মা ব্যারেজের অনুমোদিত ডিপিপি, পিডির গ্রেড ও জনবল কাঠামো, নিয়োগের নোটশিট ও সুপারিশ, বাপাউবোর জ্যেষ্ঠতা তালিকা, বিবেচিত কর্মকর্তাদের তালিকা এবং হাসান মাহমুদের সার্ভিস রেকর্ড প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে বগুড়া ও চরফ্যাশনে তাঁর দায়িত্বকালীন কাজের দরপত্র ও কার্যাদেশ, অডিট আপত্তি, বিভাগীয় তদন্ত কিংবা দুদকের কোনো অনুসন্ধান থাকলে তার বর্তমান অবস্থাও প্রকাশ করা প্রয়োজন। কারণ প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার সরকারি অর্থে বাস্তবায়নাধীন এ মেগা প্রকল্পে পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ নয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি প্রকাশ এবং স্বাধীন যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমেই এ বিতর্কের প্রকৃত উত্তর বেরিয়ে আসতে পারে।
মন্তব্য করুন