প্রকাশিত: ৫ ঘন্টা আগে, ১১:১১ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
মেয়ের বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করতে জামালপুর থেকে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন ইসমাইল হোসেন (৪৯)। কথা ছিল জিরানী এলাকায় এসে ছেলের সাথে সাক্ষাৎ করবেন। কিন্তু তার গন্তব্যে পৌঁছানো হয়নি। ঢাকার বনানী এক্সপ্রেসওয়ে থেকে তার মুখে স্কসটেপ পেঁচানো মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় জমি বিক্রির পাঁচ লাখ টাকা ও দুইটি মোবাইল ফোন গায়েব হয়। নিহতের গ্রামের বাড়ি জামালপুরে এখন চলছে শোকের মাতম। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহতের পরিবার ও স্বজনদের দাবি, হত্যাকারীদের যেন দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়।
স্ত্রী ও দুই সন্তান ছাড়াও বৃদ্ধা মা, বোন ও ভাগনিকে নিয়ে ছিল ইসমাইল হোসেনের সংসার। সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের হবদেশ গ্রামে থাকতেন ইসমাইল। অভাব অনটনের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে ৪ বছর আগে সপরিবারে গাজীপুরে চলে যান ইসমাইল হোসেন। সেখানে গিয়ে ডেল্টা স্পিনিং মিলে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ পান তিনি। এছাড়াও তার স্ত্রী ও ছেলে পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তিনজনের আয়ে তাদের সংসার ভালোই চলতে থাকে। তারা থাকতেন গাজীপুরের কাশিমপুরে। কিন্তু ৯ মাস আগে অসুস্থতার কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ৫ মাস পরিবারের সাথে সেখানেই বসবাস করছিলেন ইসমাইল হোসেন। পরে গাজীপুরের কাশিমপুর থেকে গত চার মাস আগে তিনি জামালপুরে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন। এরমধ্যে স্থানীয় এক ছেলের সাথে তার মেয়ে শারমিন আক্তারের বিয়ে ঠিক হয়।
কিছুদিন আগে তিনি ১০ লাখ টাকায় নিজ বাড়ির ১০ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। সেই টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ ও বসতঘর নির্মাণ করেন। কথা ছিল মেয়ের বিয়ের জন্য ৫ লাখ টাকা রেখে অবশিষ্ট টাকায় তিনি কিছু করবেন। তাই মেয়ের বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করতে জমি বিক্রির ৫ লাখ টাকা নিয়ে গত ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ভোর রাতে বাসে করে জামালপুর থেকে গাজীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন ইসমাইল হোসেন। টাকা ছাড়াও তার সাথে ছিল দুইটি মোবাইল ফোন ও মেয়ের বিয়ের জন্য কিছু কাঁচা বাজার। সেই রাতে তিনি ভ্যানগাড়িতে করে দিগপাইত বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাসে করে গাজীপুরের জিরানীর উদ্দেশ্যে রওনা হন। পরে শুক্রবার সকাল থেকে ইসমাইলের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে বনানী এক্সপ্রেসওয়েতে মুখে স্কচটেপ পেঁচানো তার মরদেহ উদ্ধার করে বনানী থানার পুলিশ। এরপর দুপুরে বনানী থানা থেকে জামালপুর সদর উপজেলার নারায়ণপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের মাধ্যমে ইসমাইল হোসেনের মৃত্যুর খবর পায় পরিবার। ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে গ্রামের বাড়িতে ইসমাইল হোসেনের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়। এরপর থেকেই তার পরিবারে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের প্রধান আশ্রয়টি হারিয়ে তারা এখন অসহায়।
এ ঘটনায় নিহতের ছেলে হাসান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। পরে পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে ইসমাইল যে বাসে করে যাচ্ছিল সেই বাসের চালক সোহেল রানা (৪১), সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) এবং সহকারী (হেলপার) মো. মনির হোসেনকে (১৯) গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ইসমাইলের স্ত্রী হাসনা বেগম বলেন, আমার স্বামী আমাদের ওপরে বটগাছ হয়েছিল। সে জমি বিক্রি করার টাকা নিয়ে মেয়ের বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করতে যাচ্ছিল। খুনিরা আমার সব শেষ করে দিল। আমার স্বামীকে যারা হত্যা করেছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই।
ইসমাইলের মেয়ে শারমিন আক্তার বলেন, বাবা যখন বাসে করে আমাদের এখানে আসছিল, তখন আমাকে ফোন করে বলল, আম্মা তুমি কি খাবা, তোমার জন্য কি আনবো। আমি বলছি, আব্বা তুমি আগে আসো, অনেক দিন তোমায় দেখি না। তুমি আসার পর তোমাকে বলমু যে আমি কি খাবো। তখন তুমি দোকান থেকে কিনে এনে দিও। আমি নতুন জীবনে পা দিতে যাওয়ার সময় আমার বাবা খুন হল। আমি এটার বিচার চাই।
জামালপুর সদর উপজেলার নারায়ণপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই মঞ্জুরুল হক বলেন, বনানী থানা থেকে বার্তা পেয়ে আমরা নিহতের পরিবারকে খবর দেই। পরে তারা সেখানে গিয়ে মরদেহ নিয়ে আসে।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, গত ৪ সেপ্টেম্বর সকালে যে ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তার পরিচয় তথ্যপ্রযুক্তি ও হাতের আঙুলের ছাপের (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। পরে তার পরিবারের সদস্যরা থানায় আসেন। মরদেহের ছবি দেখে তারা তাকে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় ইসমাইলের ছেলে হাসান বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে বনানী থানায় মামলা করেন। পরে আমরা ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা শুরু করি। ফুটেজ দেখে ‘রাজ ক্লাসিক’ নামের একটি বাসের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হয়। পরে বাসটি শনাক্ত করে জামালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়।
তিনি বলেন, মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে বাসটি জব্দ করা হয়। একই সময় বাসের সুপারভাইজার সাজু ও সহকারী মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পৃথক অভিযানে বাসচালক সোহেলকেও গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর আসামিরা জানান ৪ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে চারটার দিকে জামালপুর থেকে ইসমাইল বাসে ওঠেন। একপর্যায়ে ইসমাইলের কাছে ভাড়া চান সুপারভাইজার সাজু। ইসমাইল তার লুঙ্গির কোচর থেকে টাকা বের করে ভাড়া দেন। তখন সাজুর ধারণা হয়, ইসমাইলের কাছে অনেক টাকা আছে। তিনি বিষয়টি বাসচালক সোহেলকে জানান।
কমিশনার আরও বলেন, এরপর তারা ইসমাইলের কাছ থেকে টাকা কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা ইসমাইলকে গাজীপুরে না নামিয়ে অন্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন জায়গায় নামিয়ে দেন। পরে সাজু ও মনির মিলে ইসমাইলের দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। তার নাক-মুখও স্কচটেপ দিয়ে আটকে দেন এবং গামছা গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে ইসমাইলের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। পরে ইসমাইলের মরদেহ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী অংশে ফেলে দেয়।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন