বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৩ ঘন্টা আগে, ১২:৫৯ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

কেন শুক্রবার, জুমার নামাজ ঘিরে নাশকতার নতুন ছক?

ছবি; সংগৃহিত

এক শুক্রবারে গুলশানে ঝটিকা মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণ, পরের শুক্রবারে রাজধানীর একাধিক এলাকায় ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণ। এর সঙ্গে রাতের দিকে থানার সামনে যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা। কয়েক মিনিটের মধ্যে এসব নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে দ্রুত সরে পড়ছে জড়িতরা। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে তাদের কথিত কর্মসূচি। ফলে ঘটনার পর মামলা দায়ের, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া শুরু হলেও ঘটনার আগেই তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সর্বশেষ গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরের পর থেকে রাত পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। মালিবাগ রেলগেট, মহাখালী, আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ী, বাবুবাজার ও মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব খবর পাওয়া যায়। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা পুলিশ বক্সের সামনে ককটেল বিস্ফোরণে ইবাদুর রহমান (২৬) নামে এক অটোরিকশাচালক আহত হন। রাত ১০টার পর কাফরুল থানার সামনে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। তবে, এসব ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। কাফরুল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, রাত ১০টার পর থানার সামনে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। এতে কেউ হতাহত হননি। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে এবং এর পেছনে দুষ্কৃতকারীরা জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
একই দিনে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া এমন ধারাবাহিক ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— একটি ঘটনা শেষ হতে না হতেই কীভাবে আরেকটি ঘটনা ঘটছে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি আগে থেকে এসব অপতৎপরতার কোনো আভাস পাচ্ছে না? আর যদি আভাস থেকে থাকে, তবে তা আগেভাগে ঠেকানো যাচ্ছে না কেন? এসব ঘটনার পর অবশ্য রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। বিভিন্ন এলাকায় ২০০টি চেকপোস্ট বসানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে, নিরাপত্তা জোরদারের এই উদ্যোগ এসেছে মূলত অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়— শুক্রবারকে কেন্দ্র করে ঝটিকা মিছিল বা নাশকতার আশঙ্কা যদি আগে থেকেই থেকে থাকে, তবে আগাম প্রস্তুতি কেন নেওয়া হচ্ছে না?
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত দল আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা একটি ঝটিকা মিছিল বের করার চেষ্টা করে। পুলিশ মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে গেলে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। জবাবে পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধারসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয় এবং ধারাবাহিক অভিযানে আরও বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ওই ঘটনার পর গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেন ও গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার এম তানভীর আহমেদকে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি ও গোয়েন্দা তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিলের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য ছিল। তবে, শুক্রবার জুমার নামাজের সময় সেখানে এসে তারা এমন কর্মকাণ্ড চালাবে, পুলিশ হয়তো তা ধারণা করতে পারেনি। মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরই শুক্রবারের সময়কে ঘিরে নিরাপত্তার বড় প্রশ্নটি সামনে আসে।
সাধারণত শুক্রবার জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে রাজধানীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল ও সমাগম বেড়ে যায়। দুপুরের আগে থেকেই বিভিন্ন সড়কে ভিড় তৈরি হয়। এমন বড় জনসমাবেশের সুযোগ নিয়ে একদল লোক হঠাৎ জড়ো হয়ে মিছিল করে দ্রুত কেটে পড়লে তাদের আলাদাভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলে দুষ্কৃতকারীদেরও তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়।
তবে, অপরাধের জন্য শুক্রবারকে বেছে নেওয়ার পেছনে নিশ্চিত কারণ কী, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনও স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ধরন, সময় ও স্থান বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রের দাবি, গত কয়েক সপ্তাহে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নামে ঢাকাসহ চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ঝটিকা মিছিল হয়েছে। এসব কর্মসূচির মূল বৈশিষ্ট্য হলো— অল্পসংখ্যক লোক হঠাৎ জড়ো হয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে মিছিল বা স্লোগান দিয়ে পুলিশ আসার আগেই সটকে পড়ে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, আগামী ডিসেম্বরকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ তাদের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টা করছে। দীর্ঘ দিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর সাংগঠনিক অস্তিত্ব জানান দিতে তারা ঝটিকা মিছিলকে কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে। একই সঙ্গে পলাতক জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের যোগাযোগ বাড়ছে এবং তারা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দেশনা আদান-প্রদান করছেন। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের একটি আলোচিত ভিডিওচিত্র— যেখানে ডিসেম্বরে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঝটিকা মিছিলগুলোকে সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখা হলেও, এর আড়ালে বড় ধরনের নাশকতার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। এমনকি ১৮ সেপ্টেম্বরের বিস্ফোরণ ও বাসে আগুনের সঙ্গে ডিসেম্বর কেন্দ্রিক রাজনৈতিক তৎপরতার সরাসরি কোনো যোগসূত্র পুলিশ এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি।

বাংলাধারা/ডেস্ক

মন্তব্য করুন