প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৩:৩৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, গণভোটে জনগণ যে সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়ার অনুমোদন দিয়েছেন, সেটিকে পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে বিকল্প কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাকে সাধারণ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনৈতিক ইচ্ছার অধীন করা যায় না। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে ১১ দলীয় ঐক্যের অবস্থান তুলে ধরতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একই তফসিলে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত সাংবিধানিক সংস্কার এবং তা বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণের মতামত নেওয়া হয়। সরকারি গেজেট অনুযায়ী বৈধ ভোটের প্রায় ৬৯ শতাংশ বা ৬৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ ভোট ‘হ্যাঁ’ পড়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটে জনগণ শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু সাংবিধানিক প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানাননি। তারা সংবিধান সংস্কারের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও প্রতিষ্ঠানকেও অনুমোদন দিয়েছেন। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
তার দাবি, ১১ দলীয় ঐক্যের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদের সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি থেকে নির্বাচিত সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সাংবিধানিক সংকটের মূল প্রশ্ন এখানেই। সংসদ সদস্য হিসেবে প্রাপ্ত ক্ষমতা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে জনগণের গণভোটে অর্পিত গাঠনিক ক্ষমতা এক নয়। একই ব্যক্তি দুটি প্রতিষ্ঠানের সদস্য হতে পারেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান দুটির ক্ষমতার উৎস, আইনগত পরিচয় ও দায়িত্ব এক নয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের মতে, জাতীয় সংসদ একটি ‘ঈড়হংঃরঃঁঃবফ ইড়ফু’, অর্থাৎ সংবিধান কর্তৃক সৃষ্ট প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে সংবিধানের মৌলিক পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে জনগণই চূড়ান্ত সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। জনগণের এই গাঠনিক ক্ষমতাকে সাংবিধানিক পরিভাষায় ‘ঈড়হংঃরঃঁবহঃ চড়বিৎ’ বলা হয়।
তিনি বলেন, সংবিধান সংসদ সৃষ্টি করে, সংসদ জনগণকে সৃষ্টি করে না। রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ। তাই জনগণ যখন সরাসরি গণভোটের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সংস্কার প্রক্রিয়া অনুমোদন করেন এবং সেই সংস্কার সম্পন্ন করার জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদকে দায়িত্ব দেন, তখন সাধারণ সংসদীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে সেই ম্যান্ডেটের বিকল্প প্রক্রিয়া তৈরি করা গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
তিনি আরও বলেন, গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছেন, সেই রায়ের প্রতি সম্মান দেখানো এবং অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় তা বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্র ও সরকারের গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। কিন্তু গণভোটের গণরায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে বিষয়টিকে সাধারণ সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের অবস্থান তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটে জনগণ যে প্রক্রিয়া অনুমোদন করেছেন, তাকে পাশ কাটিয়ে কোনো বিকল্প প্রক্রিয়াকে জনগণের ম্যান্ডেটের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। জনগণের ভোট কোনো রাজনৈতিক দলের সুবিধা-অসুবিধা কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিবেচনায় গ্রহণ, বর্জন বা উপেক্ষা করার বিষয় নয়। গণরায়ের প্রতি সম্মান দেখানোই গণতন্ত্রের মৌলিক দাবি।
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়া হলেও এই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে প্রতিষ্ঠিত ‘ইধংরপ ঝঃৎঁপঃঁৎব উড়পঃৎরহব’ অনুসারে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সাধারণ সংশোধনী ক্ষমতার মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায় না।
তিনি বলেন, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা গেলেও জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা ছাড়া সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের এখতিয়ার সংসদের নেই। এ ক্ষেত্রে তিনি অতীতে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হওয়ার নজিরের কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, সংসদের ক্ষমতা সংবিধান থেকে উৎসারিত। অন্যদিকে ‘ঈড়হংঃরঃঁবহঃ চড়বিৎ’-এর মূল উৎস জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংস্কারের বিষয়ে যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন, সেটিই এখানে বিবেচ্য।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠনের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ আলোচনা, মতবিনিময়, ঐকমত্য ও বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্য দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ প্রণীত হয়।
পরবর্তী সময়ে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। ওই আদেশে জুলাই সনদের সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়গুলো জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে গণভোটে উপস্থাপনের বিধান রাখা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ‘হ্যাঁ’ বলার পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে সংস্কার সম্পন্ন করার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ জনগণের রায় শুধু ‘সংস্কার চাই’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ ছিল না; কোন সংস্কার, কোন ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে এবং কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় তা বাস্তবায়ন হবে, সেই কাঠামোর প্রতিও সম্মতি নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিএনপির ৩১ দফার প্রসঙ্গ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রশ্ন করেন, যে বিষয়কে বিএনপি তাদের ৩১ দফার প্রথম দফায় ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ ও ‘সাংবিধানিক সংস্কার’ হিসেবে জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে, ক্ষমতায় এসে সেই বিষয়কে কেন শুধু সংসদীয় ‘সংশোধন’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের ম্যান্ডেটের বিকল্প সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়। জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার বিকল্প কোনো বিশেষ কমিটিও নয়। গণতন্ত্রে সংসদ গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনগণই সার্বভৌম। জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের ক্ষমতা দেন এবং সেই ক্ষমতার সীমা ও উদ্দেশ্যও নির্ধারণ করেন।
১১ দলীয় ঐক্যের অবস্থান তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তারা জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে এবং গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ জনগণের ভোটের রায় বাস্তবায়নের পক্ষে। একই সঙ্গে জনগণের সার্বভৌম ও গাঠনিক ক্ষমতার মর্যাদা রক্ষার পক্ষেও তারা অবস্থান নিয়েছেন।
এ সময় ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে ছয়টি দাবি তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, গণভোটে জনগণের প্রদত্ত রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত ও গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন, গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের বর্তমান উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরিষদকে কার্যকর করা।
এ ছাড়া জনগণের সম্মতি ও গণভোটের ম্যান্ডেট পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো-সংশ্লিষ্ট পরিবর্তন আনার উদ্যোগ থেকে বিরত থাকা এবং জনগণের প্রত্যাশা, গণভোটের রায় ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, সংবিধানের চূড়ান্ত ক্ষমতার উৎস জনগণ। সংসদ সংবিধানের অধীন এবং রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। সংসদের সংশোধনী ক্ষমতা অর্পিত ক্ষমতা; আর জনগণের ‘ঈড়হংঃরঃঁবহঃ চড়বিৎ’ হলো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কর্তৃত্বের মূল উৎস। তাই গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সাংবিধানিক ম্যান্ডেট দিয়েছেন এবং যে প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মতি জানিয়েছেন, সেই ম্যান্ডেটের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের গণরায়ের বাস্তবায়ন এবং জনগণের সার্বভৌম সাংবিধানিক অধিকারের পক্ষে রাজনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।
সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন