প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৪:৩০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ইঞ্জিন সংকটে চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল অনেকটা কমে গেছে। একসময় চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড (সিজিপিওয়াই) থেকে প্রতিদিন একাধিক কনটেইনারবাহী ট্রেন ঢাকার কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) চলাচল করলেও এখন কোনো দিন একটি, কোনো দিন দুটি ট্রেন চলছে। অনেক সময় এক দিনেও কোনো কনটেইনারবাহী ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না।একইভাবে চট্টগ্রাম থেকে সিলেট, শ্রীমঙ্গল ও রংপুরগামী তেলবাহী ট্রেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য, গম ও সার পরিবহনকারী ট্রেনের চলাচলও ব্যাপকভাবে কমেছে। এতে একদিকে ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনে ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে রাজস্ব হারাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬০১, ৬০৩, ৬০৫ ও ৬০৭ নম্বর কনটেইনারবাহী ট্রেন দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় দিনে সর্বোচ্চ চারটি ট্রেন চলাচল করত। বর্তমানে এসব ট্রেনের সংখ্যা কমে দিনে এক থেকে দুইটিতে নেমেছে। অনেক দিন কোনো ট্রেনই চলাচল করে না।
চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী ৯৫১ নম্বর তেলবাহী ট্রেন আগে সপ্তাহে দুটি চলাচল করলেও এখন মাসে একটিও নিয়মিত যাচ্ছে না। ৯৬১ নম্বর তেলবাহী ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে শ্রীমঙ্গল রুটে সপ্তাহে এক থেকে দুটি চলাচল করত। বর্তমানে মাসে মাঝে মাঝে একটি ট্রেন চলছে। আর ৯৮১ নম্বর তেলবাহী ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে রংপুরে সপ্তাহে একটি চলাচল করলেও গত তিন মাসে মাত্র একটি ট্রেন চলেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া রংপুর বিসি, দিনাজপুর বিসি ও তারাকান্দি বিসি নামে খাদ্য, গম ও সারবাহী ট্রেন এবং আশুগঞ্জ সাইলোগামী গমবাহী ট্রেনও নিয়মিত চলাচল করত। বর্তমানে ইঞ্জিন সংকটের কারণে এসব ট্রেনও প্রায় বন্ধ রয়েছে।
রেলওয়ের সাম্প্রতিক তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচল ২ হাজার ৭৭০টি থেকে কমে ১ হাজার ৪৬৭টিতে নেমেছে।
রেলওয়ের পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কনটেইনার পরিবহন থেকে আয় হয়েছে ৭৭ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৭৩ কোটি টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রায় এক দশকের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন আয়।
এ নিয়ে টানা চতুর্থ বছর কনটেইনার পরিবহন থেকে রেলের আয় কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাত থেকে সর্বোচ্চ ১৩৫ কোটি টাকা আয় হয়েছিল। এরপর ধারাবাহিকভাবে আয় কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
পণ্য পরিবহনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে রেলওয়ে ১৫ লাখ ৬০ হাজার টন পণ্য পরিবহন করেছিল। গত অর্থবছরে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে ৭ লাখ ৩০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, চট্টগ্রাম-কামালাপুর রুটে পণ্যবাহী ট্রেন চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১১টি ইঞ্জিন প্রয়োজন। কিন্তু ইঞ্জিন সংকটের কারণে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম ইঞ্জিন পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কনটেইনার ও তেলবাহী ট্রেনের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যবাহী ট্রেনের শিডিউলও ঠিক রাখা যাচ্ছে না।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ সাইফুল রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, পণ্যবাহী ট্রেন চালাতে আমাদের ১০-১১টি ইঞ্জিনের প্রয়োজন। কিন্তু ইঞ্জিন সংকটের কারণে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। গত মাসের তুলনায় এ মাসে ইঞ্জিন কিছুটা বেড়েছে। এ মাসে আমরা চার-পাঁচটি করে ইঞ্জিন দিয়ে চালাচ্ছি। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ডের (সিজিপিওয়াই) ট্রাফিক ইন্সপেক্টর এনামুল হক সিকদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ইঞ্জিনের সমস্যা রয়েছে। তবে গত কয়েক মাসের তুলনায় এখন অনেক ভালো রয়েছে। সিজিপিওয়াই থেকে এখন দুই-তিনটি কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল করে। এতদিন ট্রেন চলাচল না করায় কনটেইনারের স্তূপ পড়ে থাকলেও এখন তা আর নেই।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য সীমিতসংখ্যক ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়ার পরও যাত্রীবাহী ট্রেনে ইঞ্জিন বিকল হলে অনেক সময় ওই ইঞ্জিনও সেদিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে পণ্যবাহী ট্রেনের শিডিউল আরও ব্যাহত হয়। ফলে রেলের গুরুত্বপূর্ণ আয়কারী পরিবহন খাতগুলোর একটি ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।
রেলওয়ের অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-কামালাপুর রুটে কনটেইনার পরিবহন রেলের অন্যতম প্রধান আয়কারী খাত। একটি কনটেইনারবাহী ট্রেন চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ড থেকে ঢাকার আইসিডিতে গেলে রেলের প্রায় ১৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। অথচ ইঞ্জিন সংকটে এ ধরনের ট্রেন নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না।
রেলপথে পণ্য পরিবহন সড়কপথের তুলনায় সাশ্রয়ী হলেও সময়মতো ট্রেন না পাওয়ায় ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সড়কপথে পণ্য পরিবহনে ঝুঁকছেন। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ২০ ফুটের একটি কনটেইনার রেলে পরিবহনে খরচ প্রায় ৯ হাজার ৭০০ থেকে ১৬ হাজার ১০০ টাকা। সড়কপথে একই পণ্য পরিবহনে খরচ আরও বেশি।
ইঞ্জিন সংকটের প্রভাব পড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার পরিবহনেও। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে প্রয়োজনীয় ১৩টি ইঞ্জিনের বিপরীতে মাত্র দুটি ইঞ্জিন পাওয়া যাচ্ছিল। একপর্যায়ে বন্দরের ইয়ার্ডে ১ হাজার ২০০-এর বেশি টিইইউ কনটেইনার আটকে ছিল।
ইঞ্জিন সংকটের কারণে বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনার জটের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত মাসে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছিল। আমরা কাস্টমস ও রেলওয়েকে চিঠি দিয়ে থাকি। রেল যোগাযোগ নিয়মিত চালু থাকলে কনটেইনার জট কম থাকবে। এটি নিয়মিত চালু থাকা দরকার।
এদিকে আইসিডি কমলাপুরের কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার পরিবহনে অনিয়ম এবং আমদানিকারকদের ওপর ডিটেনশন ও ডেমারেজ চার্জ আরোপ বন্ধে গত ২৫ আগস্ট রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছে ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন।
সংগঠনটির সভাপতি মো. মিজানুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মো. ফারুক আহমেদের স্বাক্ষরিত চিঠিতে পর্যাপ্ত রেল ইঞ্জিনের অভাব, অনিয়মিত ট্রেন পরিচালনা ও সমন্বয়ের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আইসিডি কমলাপুরমুখী কনটেইনার পরিবহন কমে যাওয়ায় আইসিডির কার্যক্রম অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছে। এতে কনটেইনার দীর্ঘদিন বন্দরে পড়ে থাকছে এবং আমদানিকারকদের ডিটেনশন ও ডেমারেজ চার্জ গুনতে হচ্ছে। পাশাপাশি কাঁচামাল সরবরাহ ও সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায়ও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, ইঞ্জিনের সংখ্যা কিছুটা বাড়ায় বর্তমানে আগের তুলনায় পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বেড়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় ইঞ্জিন এখনো অপ্রতুল।
কর্মকর্তাদের দাবি, পর্যাপ্ত ইঞ্জিন নিশ্চিত করে পণ্যবাহী ট্রেনের নিয়মিত শিডিউল ফিরিয়ে আনা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। অন্যথায় রেলের আয় কমার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক আমদানি-রপ্তানি ও দেশের পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সহ-সভাপতি আমজাদ হোসেন চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ইঞ্জিন সংকটে পণ্যবাহী ট্রেনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা সময়মতো পণ্য পরিবহন করতে পারছেন না। এতে আমদানিকারকদের খরচ বাড়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় ঢাকার আইসিডিতে কনটেইনার পাঠানো যায় না। আবার কারখানায় কাঁচামাল পাঠানো সম্ভব হয় না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, শ্রমিকদের বেতন পরিশোধেও সমস্যা তৈরি হয়। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, রেলওয়ের উচিত দ্রুত পর্যাপ্ত ইঞ্জিনের ব্যবস্থা করে পণ্যবাহী ট্রেনের নিয়মিত শিডিউল নিশ্চিত করা। এ বিষয়ে সরকার ও রেলওয়েকে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা উচিত।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন