প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১২:৩৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী, উপকূল, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নসহ পর্যটনের নানা উপাদান থাকলেও ফেনীতে এখনো তা শিল্পের রূপ পায়নি। পর্যটন বিকাশে জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন সময়ে নেওয়া পরিকল্পনার বেশির ভাগই আলোর মুখ দেখেনি। সম্প্রতি নতুন করে বিজয় সিংহ দিঘিকে ইকো-ট্যুরিজম পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও পর্যটন খাতে নেই জেলা প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ। ফলে সম্ভাবনার তুলনায় ফেনীর পর্যটন খাতের অগ্রগতি এখনো সীমিত। ফেনীর পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জেলার বিভিন্ন দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানকে ঘিরে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, খাবার ও শৌচাগারসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকায় পর্যটকবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়নি।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সময়ে জেলার পর্যটন সম্ভাবনা চিহ্নিত করে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজজামান পর্যটন সেল গঠন করে এসংক্রান্ত সভায় ফেনীর ২৪টি সম্ভাবনাময় স্থান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিভিন্ন দপ্তরকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে ফেনী শহরের রাজনন্দিনী দিঘির চারপাশ সংস্কার করে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনাও ছিল।
পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ফেনীর পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরতে ২০২২ সালে প্রকাশ করা হয় ‘ফেনী গাইড’। একই সময়ে ফেনী কলেজ বধ্যভূমি স্মরণে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হয়। ২০২৩ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোছাম্মৎ শাহীনা আক্তারও পর্যটন বিকাশে একাধিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। তবে এসব পরিকল্পনার অধিকাংশের দৃশ্যমান বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ ২০২৫ সালেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরের রাজবাড়ি, শহিদ জহির রায়হান হল মাঠ ও মুহুরী সেচ প্রকল্প ঘিরে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল। রাজবাড়িতে জাদুঘর, জহির রায়হান হল মাঠে আধুনিক অ্যাম্ফিথিয়েটার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকায় নদী ও স্থলভাগকে ঘিরে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। তবে এসব পরিকল্পনাও অনেকটা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
এবারও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিজয় সিংহ দিঘিকে ইকো-ট্যুরিজম হিসেবে গড়ে তোলার নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এ পরিকল্পনার জন্য পর্যটন খাতে জেলা প্রশাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নেই।
এ ব্যাপারে ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত দায়িত্ব) রিফাত আসমা ঢাকা পোস্টকে বলেন, পর্যটন শিল্পে জেলা প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নেই। নতুন জেলা প্রশাসক আসার পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে বিজয় সিংহ দিঘিকে ইকো-ট্যুরিজম পার্ক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এতে পৌরসভা ও অন্যান্য বিভাগের সহযোগিতা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
ইতিপূর্বে জেলায় পর্যটন শিল্প বিকাশে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন কোনো প্রকল্পের তথ্য নেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনে তারপর বলতে পারব।
অন্যদিকে ফেনীতে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও কয়েকটি বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ২০১৪ সালে শহরের মহিপাল বিজয় সিংহ দিঘি এলাকায় গোল্ডেন শিশু পার্কের কার্যক্রম শুরু হয়। উদ্যোক্তারা বলছেন, পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্রগুলোর উন্নয়নে সরকারি সহযোগিতা ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী সদর উপজেলার কসকা এলাকায় ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করে বিনোদন পার্ক নিহাল পল্লী। এই বিনোদন কেন্দ্রের স্বত্বাধিকারী নিজাম উদ্দিন বলেন, শুরুতে দর্শনার্থীদের ভালো সাড়া পাওয়া গেলেও যোগাযোগব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতির মুখে পড়েছে। কাজির দিঘি থেকে নিহাল পল্লী পর্যন্ত সড়ক অনুন্নত। কসকা বাজারে পরিত্যক্ত বৈদ্যুতিক খুঁটির কারণেও বড় গাড়ি চলাচলে সমস্যা হয়। বিভিন্ন সময়ে সরকারি সহায়তা চাইলেও তা পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বিভিন্ন সময় সভা হলেও উদ্যোক্তাদের দাবিগুলো রেজুলেশনে ওঠার পর বাস্তবায়ন হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফেনীর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আসাদুজ্জামান দারা বলেন, ফেনীতে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। তবে কিছু নতুন উদ্যোক্তা নিজ উদ্যোগে এ খাতে কাজ করছেন। সঠিক পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে ফেনীর পর্যটন সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ দেওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, জেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের অন্যতম বড় সমস্যা অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও নিরাপত্তার ঘাটতি। এসব মৌলিক সমস্যা সমাধান না হলে শুধু পরিকল্পনা করে পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
পর্যটন বিকাশে নেই ন্যূনতম ব্যবস্থা
ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সবুজের এক অনন্য মেলবন্ধন, ফেনী জেলা। যেখানে একইসঙ্গে পাওয়া যাবে সবুজ, নদী আর শত বছরের গল্প। শহরের কোলাহল ছেড়ে একটু প্রশান্তির খোঁজে এ জনপদ হতে পারে স্বল্প খরচে বৈচিত্র্যময় অনন্য ভ্রমণ গন্তব্য। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোল ঘেষে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে দেশের ‘নাভি’ খ্যাত ফেনী জেলার আয়তন ৯২৮ দশমিক ৩৪ বর্গ কিলোমিটার।
কবি নবীন চন্দ্র সেন, নাট্যকার সেলিম আল দীন, চলচিত্রকার জহির রায়হান, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন, ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম, শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সারসহ দেশের বহু খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচিহ্নের এ জনপদ দাঁড়িয়ে আছে পর্যটনের বিচিত্র উপাদান নিয়ে। নদী, উপকূল, দিঘি, পাহাড়, রাবার বাগান, জমিদারবাড়ি ও প্রাচীন স্থাপনার সমন্বয়ে জেলার পর্যটন সম্ভাবনার তালিকাও বেশ দীর্ঘ। তবে এসব স্থানের বেশিরভাগেই পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা নেই। ফলে দর্শনীয় স্থান থাকলেও সেগুলো ঘিরে গড়ে ওঠেনি পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থা।
ফেনীর পর্যটন সম্ভাবনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে সোনাগাজীর মুহুরী সেচ প্রকল্প ও উপকূলীয় এলাকা। শহরের রাজনন্দিনী দিঘি, মহিপালের বিজয় সিংহ দিঘি, পরশুরামের শমসের গাজী দিঘি, ছাগলনাইয়ার শিলুয়ার শিলপাথর, জগন্নাথকালী মন্দির, সাত মন্দির, কৈয়ারা দিঘি, শমসের গাজীর সুড়ঙ্গ, চাঁদগাজী ভূঞা মসজিদ ও বাঁশপাড়া জমিদারবাড়িসহ রয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান।
এ ছাড়া সদরের কাজিরবাগ ইকো পার্ক, হর্টিকালচার সেন্টার, কালিদহ বরদা বাবু জমিদারবাড়ি, চৌধুরী বাগানবাড়ি, দাগনভূঞার জমিদারবাড়ি, প্রতাপপুর জমিদারবাড়ি, ফেনী নদী, হাজীর ভাগনা, ভাষাশহীদ সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর, শর্শদীর শাহী মসজিদ, সেনেরখিল জমিদারবাড়ি, হযরত পাগলা মিয়ার তাকিয়া, ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুল ও ফেনী সরকারি কলেজ এবং পরশুরামের রাবার ড্যাম ও বীরচন্দ্র নগরের রাবার বাগান রয়েছে পর্যটনের সম্ভাবনাময় স্থানের তালিকায়।
তবে এসব স্থানের অধিকাংশেই যাতায়াত, নিরাপত্তা, খাবার, শৌচাগারসহ পর্যটকদের প্রয়োজনীয় মৌলিক সুবিধা গড়ে ওঠেনি। ফলে সম্ভাবনাময় স্থানগুলো দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করলেও সেগুলোকে কেন্দ্র করে নিয়মিত পর্যটন কার্যক্রম বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠছে না। সম্ভাবনার তালিকা দীর্ঘ হলেও পর্যটন বিকাশের আয়োজন এখনো সীমিত।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন