প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৪:১৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
দেশের তৈরি পোশাক খাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে প্রায় ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির গবেষণা বলছে, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে কারখানাগুলোতে জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি শিল্প খাতের কার্বন নিঃসরণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সিপিডির হিসাবে, প্রয়োজনীয় মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭১ শতাংশই করতে হবে দেশের বড় আকারের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে। যথাযথ মডেল অনুযায়ী পুরোনো ও কম দক্ষ যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা গেলে বছরে প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত শক্তি সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে।
রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ অন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিকার্বনাইজেশন’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে উপস্থাপিত এক গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গবেষণার মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট সামি মোহাম্মদ।
অনুষ্ঠানে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, বিজিএমইএর সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার বিদ্যা অমৃত খান এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফ শাহরিয়ার উপস্থিত ছিলেন।
সংলাপের সূচনা বক্তব্যে ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিলেই বিকল্প হিসেবে এলএনজির কথা বলা হচ্ছে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়; বরং সাময়িকভাবে সংকট মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, সময় এসেছে বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর ভিত্তি করে শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলার। শিল্পকারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে পূরণ করা গেলে জ্বালানি ব্যয় ও পরিবেশের ওপর চাপ দুই-ই কমানো সম্ভব।
একইভাবে পরিবহন খাতে ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে যাওয়া এবং শিল্প ও কৃষিতে ডিজেলচালিত সেচের বিকল্প হিসেবে সৌরভিত্তিক বা বৈদ্যুতিক সেচব্যবস্থা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তবে এসব সমাধান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও বাস্তবে সেগুলোর বাস্তবায়ন যথেষ্ট দ্রুত হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন গোলাম মোয়াজ্জেম। তার মতে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের এখন জরুরি ভিত্তিতে একটি ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম’ গঠন করা প্রয়োজন, যারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার বাস্তবায়ন এগিয়ে নিতে পারে।
তিনি বলেন, সরকারের সব কার্যক্রম নিয়ম অনুযায়ী প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক সময়ের গতিতে কাজ করলে চলবে না; দ্রুত সিদ্ধান্ত ও দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
শিল্প খাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হলে তৈরি পোশাক খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সিপিডির এই গবেষক।
বাংলাদেশের ৩৫০টি তৈরি পোশাক কারখানার ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু কারখানায় যন্ত্রপাতির সংখ্যা বাড়ালেই জ্বালানি ব্যবহার কমে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও বেড়ে যায়। এ কারণে পুরোনো ও অদক্ষ যন্ত্রপাতির পরিবর্তে আধুনিক, জ্বালানিসাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছে সিপিডি।
গবেষণা অনুযায়ী, তৈরি পোশাক খাতে মোট ১৫ হাজার ২টি যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। এ জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। এর অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ শতাংশ যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করতে প্রয়োজন হবে প্রায় ৬ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব বড় কারখানায় গড়ে ২ হাজার ১০৫ জনের বেশি শ্রমিক কাজ করেন, মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এসব কারখানায় ৫০ শতাংশ আধুনিকায়ন করতে গড়ে প্রতিটি কারখানায় প্রায় ৭৩ দশমিক ১ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
অন্যদিকে, ছোট কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে অনেক কম। গড়ে ১১১ জন শ্রমিক কাজ করেন, এমন ছোট কারখানায় মোট ব্যয়ের মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বিনিয়োগ করেও উল্লেখযোগ্য জ্বালানি সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।
সিপিডির গবেষণায় বিভিন্ন বিভাগের যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও জ্বালানি সাশ্রয়ের সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কাটিং বিভাগে মোট যন্ত্রপাতির মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থাকলেও সেগুলো আধুনিক ও জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা গেলে মোট শক্তি ব্যবহারে প্রায় ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ সাশ্রয় সম্ভব।
অন্যদিকে, তৈরি পোশাক কারখানার সেলাই বিভাগে মোট যন্ত্রপাতির প্রায় ৮৫ শতাংশ থাকলেও এসব যন্ত্র প্রযুক্তিগতভাবে অপরিহার্য হওয়ায় সেখানে শক্তি সাশ্রয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম, প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ।
ডাইং ও ওয়াশিং বিভাগে গ্যাসের ব্যবহার বেশি হওয়ায় শুধু সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে শতভাগ কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব নয় বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা গেলে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে।
ছোট ও মাঝারি আকারের পোশাক কারখানাগুলো যাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে, সে জন্য সহজ শর্তে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছে সিপিডি।
একই সঙ্গে কারখানাগুলোর জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে কার্যক্ষমতা-ভিত্তিক এনার্জি অডিট বাধ্যতামূলক করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কোন কারখানায় কোথায় অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে, কোন যন্ত্রপাতি পরিবর্তন করা প্রয়োজন এবং কোথায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে—তা নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশের সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ফলে এই খাতের কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সিপিডির মতে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে এই বিনিয়োগকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যয় কমানো, উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বৈশ্বিক পরিবেশগত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।
বাংলাধারা/শারমিন
মন্তব্য করুন