- আহমেদ শাহেদ

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০২:৩২ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

বিদ্যুৎ বেসরকারিকরণ:

আলো জ্বালাতে গিয়ে যেনো সাপেবর না হয়

ছবি: বাংলাধারা

বিদ্যুৎ নিয়ে দেশের মানুষের দুশ্চিন্তার যেন শেষ নেই। গরমের তীব্রতা বাড়ছে, বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা; আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়ছে লোডশেডিং। শিল্পকারখানা থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষিকাজ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল থেকে সাধারণ মানুষের ঘর-জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রই এখন বিদ্যুতের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে না, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতি, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনে। এমন বাস্তবতায় সরকার বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। সরকারের যুক্তি- বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়বে, বিল আদায়ের হার উন্নত হবে, সিস্টেম লস কমবে এবং গ্রাহকসেবার মান বাড়বে। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এখানেই মৌলিক প্রশ্নটি সামনে আসে- বেসরকারি খাতের হাতে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা তুলে দিলেই কি দেশের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হয়ে যাবে? আমার মনে হয়, বিষয়টিকে এত সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার আলোচনা মানেই পুরো বিদ্যুৎ খাতকে বেসরকারি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া নয়। সরকারের বর্তমান বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থাকবে; তবে বিতরণ ও গ্রাহক পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার চিন্তা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎমন্ত্রীও জানিয়েছেন, এ বিষয়ে বেসরকারি খাতের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে এবং একটি কাঠামো তৈরির কাজ চলছে। কিন্তু আসল প্রশ্নের শুরু এখানেই। কারণ বিদ্যুৎ বিতরণ কোনো সাধারণ ব্যবসা নয়। একজন গ্রাহক আজ একটি কোম্পানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে কাল অন্য কোম্পানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার সুযোগ পাবেন- বিতরণব্যবস্থার বাস্তবতা এমন নয়। একটি নির্দিষ্ট এলাকার বিতরণ নেটওয়ার্ক মূলত একটি প্রাকৃতিক একচেটিয়া ব্যবস্থা। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠান যখন একটি এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব পাবে, তখন সেই এলাকার গ্রাহকের হাতে বাস্তবে বিকল্প খুব কমই থাকবে।

এ কারণেই বিদ্যুৎ বিতরণে বেসরকারিকরণের প্রশ্নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। সরকার যদি বেসরকারি খাতকে এই খাতে যুক্ত করে, তাহলে প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে- কোনো বিশেষ গোষ্ঠী, ব্যবসায়ী বা কোম্পানি যেন বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার ওপর অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। কারণ সরকারি একচেটিয়ার জায়গায় যদি বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি হয়, তাহলে জনগণের লাভটা কোথায়? বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একটি কোম্পানি যদি কোনো অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার একক নিয়ন্ত্রণ পায় এবং তার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তাহলে সেই এলাকার গ্রাহককে বাস্তবে ওই কোম্পানির শর্তেই চলতে হবে। বিদ্যুৎ বিল, নতুন সংযোগ, মিটার, অভিযোগ নিষ্পত্তি, সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, সেবার মান- প্রতিটি ক্ষেত্রেই তখন কোম্পানির সিদ্ধান্ত বড় হয়ে উঠতে পারে। তাই সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হওয়া উচিত শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দক্ষ করে তোলা নয়; বরং তাদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় রাখা।

আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতাও বলে, বেসরকারি মানেই দক্ষ আর সরকারি মানেই অদক্ষ- এমন কোনো চিরন্তন সত্য নেই। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য মুনাফা অর্জন, আর রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব জনসেবা নিশ্চিত করা। এই দুইয়ের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ বিতরণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে মুনাফা ও জনস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে না পারলে পুরো উদ্যোগই প্রশ্নের মুখে পড়বে। কোনো কোম্পানি বিনিয়োগ করবে, ঝুঁকি নেবে এবং মুনাফা করবে- এটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই মুনাফার নিশ্চয়তা দিতে গিয়ে যদি বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয়, সরকারের কাছ থেকে বাড়তি ভর্তুকি দিতে হয় কিংবা কোম্পানির লোকসানের দায় শেষ পর্যন্ত জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে হয়, তাহলে সেই বেসরকারিকরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

বিশেষ করে বিদ্যুতের দাম নিয়ে সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। সাধারণ মানুষ এমনিতেই জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চাপে আছে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু একটি পরিবারের মাসিক বিদ্যুৎ বিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বাড়ে, কৃষকের সেচ খরচ বাড়ে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ব্যয় বাড়ে, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দামও বাড়তে পারে। অর্থাৎ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। তাই বেসরকারি কোম্পানির বিনিয়োগের রিটার্ন নিশ্চিত করার নামে যদি বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়, তাহলে সরকারের একটি ভালো উদ্যোগও সাধারণ মানুষের কাছে নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আরেকটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে, সেটি হলো চুক্তি। কোনো বেসরকারি কোম্পানিকে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব দেওয়ার আগে সরকারের সঙ্গে তাদের কী ধরনের চুক্তি হচ্ছে, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। কোম্পানি কত টাকা বিনিয়োগ করবে, কত বছরের জন্য দায়িত্ব পাবে, কী পরিমাণ সিস্টেম লস কমাতে হবে, গ্রাহকসেবার মানদণ্ড কী হবে, বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যর্থ হলে কী ধরনের জরিমানা হবে, গ্রাহকের অভিযোগ কত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে, কোম্পানি কতটা মুনাফা করতে পারবে এবং কোনো কারণে প্রতিষ্ঠানটি ব্যর্থ হলে সরকার কীভাবে সেই ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে নেবে- এসব বিষয় চুক্তিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, এসব চুক্তি জনগণের কাছ থেকে গোপন রাখা যাবে না। জনগণের অর্থ, জনগণের সম্পদ এবং জনগণের মৌলিক সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বড় চুক্তি অস্বচ্ছতার মধ্যে করা উচিত নয়। অতীতে বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন চুক্তি, ব্যয় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে ধরনের প্রশ্ন উঠেছে, সেখান থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। একই ভুল নতুন কাঠামোয় আবার করা যাবে না। বিশেষ করে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার জন্য দরপত্রের শর্ত এমনভাবে তৈরি করা যাবে না, যাতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে যায়। যোগ্যতা, বিনিয়োগ সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, আর্থিক সামর্থ্য এবং সেবার মানের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে হবে। কে কতটা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, কে কার ঘনিষ্ঠ- এসব কোনোভাবেই বিবেচনার বিষয় হতে পারে না।

এখানে মালিকানার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, একই গোষ্ঠী যদি জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় এবং শেষ পর্যন্ত বিতরণব্যবস্থারও বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে সেখানে স্বার্থের সংঘাত তৈরির আশঙ্কা থাকবে। একটি কোম্পানি একই সঙ্গে উৎপাদক, সরবরাহকারী এবং বিতরণকারী হয়ে গেলে বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা কতটা থাকবে, সেটিও গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। তাই বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি মালিকানার কেন্দ্রীভবন এবং একচেটিয়া আধিপত্য ঠেকানোর জন্য কঠোর নীতি প্রয়োজন। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, বিদ্যুৎ খাত যেন কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়ে যায়।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। শুধু বিতরণব্যবস্থা দুর্বল বলেই বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ, গ্যাস ও এলএনজি আমদানি, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানির দাম, ডলার সংকট, সঞ্চালন অবকাঠামো, জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার, উৎপাদন ব্যয় এবং পুরো খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা- সবকিছুই এই সংকটের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোথাও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি না থাকায় কেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। কোথাও আবার উৎপাদিত বিদ্যুৎ থাকলেও সঞ্চালনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে তা প্রয়োজনীয় জায়গায় পৌঁছানো যাচ্ছে না। ফলে শুধু বিতরণব্যবস্থা বেসরকারি করে দিলেই ঘরে ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চলে আসবে- এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বরং সরকারের উচিত বিদ্যুৎ খাতকে একটি সমন্বিত সংস্কারের আওতায় আনা। উৎপাদন থেকে জ্বালানি, জ্বালানি থেকে সঞ্চালন এবং সঞ্চালন থেকে বিতরণ- প্রতিটি স্তরের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে। কোথায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হচ্ছে, কোথায় সিস্টেম লস বেশি, কোথায় দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা রয়েছে, কোথায় অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, কোথায় নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং কোথায় বিদ্যমান অবকাঠামোর সংস্কার দরকার-এসব বিষয় তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা জরুরি। বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা যেতে পারে, কিন্তু সেটিকে কোনোভাবেই বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক সংস্কারের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিদ্যুৎ খাতকে যেন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর মুনাফা অর্জনের ক্ষেত্র বানানো না হয়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেসরকারি স্বার্থে ছেড়ে দেওয়া- দুটি এক বিষয় নয়। সরকার যদি সত্যিই জনগণের জন্য বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে চায়, তাহলে তাকে নিশ্চিত করতে হবে, এই পরিবর্তনের সুফল সবার আগে গ্রাহক পাবে। সিস্টেম লস কমলে তার সুফল গ্রাহক পাবে, বিল আদায়ের দক্ষতা বাড়লে তার সুফল গ্রাহক পাবে, পরিচালন ব্যয় কমলে তার সুফল গ্রাহক পাবে এবং সেবার মান বাড়লে তার সুফলও গ্রাহক পাবে। শুধু কোম্পানির মুনাফা বাড়বে আর জনগণ আগের মতোই দুর্ভোগ পোহাবে- এমন সংস্কারের প্রয়োজন নেই।

এখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা দরকার। বিদ্যুৎ বিতরণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়ে সরকার যদি নিজে পুরোপুরি পিছিয়ে যায়, তাহলে চলবে না। বরং সরকারকে নীতি নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের জায়গায় আরও শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত রেখে তাদের হাতে কার্যকর ক্ষমতা দিতে হবে। কোনো কোম্পানি নির্ধারিত মান অনুযায়ী সেবা দিতে ব্যর্থ হলে জরিমানা করতে হবে, প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল বা চুক্তি বাতিলের সুযোগ রাখতে হবে। গ্রাহকের অভিযোগ জানানোর জন্য স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো গ্রাহক অন্যায় বিল, মিটার জটিলতা বা সংযোগসংক্রান্ত সমস্যার মুখে পড়লে তাকে যেন কোম্পানির দরজায় দিনের পর দিন ঘুরতে না হয়। এসব নিশ্চয়তা ছাড়া বেসরকারিকরণ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়। এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত একটি সেবা এবং দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই বিদ্যুৎ খাত নিয়ে যে কোনো সিদ্ধান্তে লাভ-ক্ষতির হিসাব শুধু কোম্পানির আয়-ব্যয়ের খাতায় করা যাবে না। দেখতে হবে- কৃষক কী পেলেন, শিল্প উদ্যোক্তা কী পেলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কী পেলেন, শিক্ষার্থী কী পেল, হাসপাতাল কী পেল এবং সাধারণ পরিবারের জীবন কতটা সহজ হলো। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সংস্কারের সাফল্য নির্ধারিত হবে জনগণের জীবন কতটা স্বস্তি পেল তার ওপর, কোনো কোম্পানির মুনাফা কতটা বাড়ল তার ওপর নয়।

সরকারের হাতে এখন একটি বড় সুযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটিয়ে বিদ্যুৎ খাতকে নতুন কাঠামোয় সাজানোর সুযোগ। কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগাতে গিয়ে যেন নতুন কোনো স্বার্থগোষ্ঠীর হাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের নিয়ন্ত্রণ চলে না যায়, সেদিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অদক্ষতা দূর করতে গিয়ে বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি করা কোনোভাবেই সংস্কার হতে পারে না। জনগণের ভালো করতে গিয়ে যদি শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বেশি বিল দিতে হয়, বেশি শর্ত মানতে হয় এবং দুর্বল সেবার জন্য একটি কোম্পানির কাছে জবাবদিহি করতে হয়, তাহলে সেটি হবে অনেকটা আলো জ্বালাতে গিয়ে নিজের ঘরেই সাপ ডেকে আনার মতো।

তাই বিদ্যুৎ বিতরণে বেসরকারি খাত আসুক- যদি তা দক্ষতা বাড়ায়। বেসরকারি বিনিয়োগ আসুক- যদি তা নতুন প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত গ্রাহকসেবা নিয়ে আসে। কিন্তু কোনো বিশেষ কোম্পানি বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একক আধিপত্য তৈরি হোক, সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকারের কাজ শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করা নয়; বরং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানই জনগণের ওপর অযাচিত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে না পারে। বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে, কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের অধিকারকে বিসর্জন দিয়ে নয়।

শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাত সংস্কারের একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত জনগণের স্বার্থ। জনগণ কি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছে? বিদ্যুতের দাম কি সহনীয় থাকছে? সেবার মান কি বাড়ছে? দুর্নীতি ও অপচয় কি কমছে? রাষ্ট্রের আর্থিক চাপ কি কমছে? শিল্প ও কৃষিতে উৎপাদন কি বাড়ছে? সাধারণ মানুষের জীবন কি কিছুটা সহজ হচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি ইতিবাচক হয়, তবেই এই সংস্কার সফল বলা যাবে। আর যদি দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় অদক্ষতার জায়গায় বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি হয়েছে, জনগণের বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে, সেবার মান কাঙ্ক্ষিতভাবে বাড়েনি এবং লাভ চলে গেছে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের পকেটে, তাহলে সেই সংস্কার জনগণের জন্য নয়; বরং এটি নতুন একটি সমস্যার জন্ম দেবে।

বিদ্যুৎ খাতকে বাঁচাতে সংস্কার দরকার। বেসরকারি বিনিয়োগও প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রতিযোগিতা, দক্ষ নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বার্থের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার। কারণ জনগণের ভালো করতে গিয়ে যেন শেষ পর্যন্ত সেই জনগণের ঘাড়েই ভালো করার পুরো মূল্য চাপিয়ে দেওয়া না হয়। বিদ্যুৎ খাত কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তোলার জায়গা নয়। এটি জনগণের সম্পদ, রাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পদ এবং অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। সেই সম্পদের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসুক, প্রয়োজনে বেসরকারি অংশগ্রহণও বাড়ুক; কিন্তু নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে রাষ্ট্র যেন এক মুহূর্তের জন্যও অসতর্ক না হয়।

কারণ শেষ বিচারে মানুষ বিদ্যুৎ চায়- কোম্পানির নাম নয়। মানুষ চায় নিরবচ্ছিন্ন আলো, সহনীয় বিল এবং নির্ভরযোগ্য সেবা। সেই আলো জ্বালানোর পথে সরকার যদি বেসরকারি খাতকে অংশীদার করে, তা হোক জনগণের স্বার্থে, জনগণের ওপর নয়। রাষ্ট্রীয় অদক্ষতার অন্ধকার কাটাতে গিয়ে যেন বেসরকারি একচেটিয়ার নতুন অন্ধকার তৈরি না হয়। আলো জ্বালাতে গিয়ে যেন শেষ পর্যন্ত সাপের ছোবল খেতে না হয়—বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার প্রস্তাবিত সংস্কারে এ সতর্কতাটিই সবচেয়ে বেশি মনে রাখা জরুরি।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বাংলাধারা/শারমিন

মন্তব্য করুন