বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ২ ঘন্টা আগে, ০১:০৮ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

বন্যায় ভেসে গেছে মাথা গোঁজার ঠাঁই, কিস্তি আদায়ে দুয়ারে এনজিও কর্মী

চোখের সামনেই মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে গেল জীবনের সবটুকু সঞ্চয় আর শেষ অবলম্বন। ঢলের তোড়ে ভেসে গেছে মাথা গোঁজার একমাত্র ঘরটি। অবশিষ্ট বলতে এখন শুধু মাথার ওপর তপ্ত খোলা আকাশ আর পরনের কাপড়। প্রলয়ংকরী বন্যার এই চরম দুর্দিনেও পিছু ছাড়েনি ঋণের বোঝা। চোখের জল মুছতে না মুছতেই, বিধ্বস্ত উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছেন এনজিও কর্মী। ঘর না থাকলেও, নিয়মের বেড়াজালে কিস্তি চাই-ই চাই।
হৃদয়বিদারক ও নির্মম এই চিত্রটি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার কালীপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বদণ্ডী ধূপীপাড়া গ্রামের। 
বুধবার (১৫ জুলাই) সকালে বন্যার সেই ভয়াবহতা ও পরবর্তী নির্মম বাস্তবতার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা নমীতা ধূপী।

তিনি জানান, তার স্বামী হারাধান ধূপী পেশায় একজন দিনমজুর। তিন ছেলে বিয়ে করে আলাদা সংসার পেতেছেন। বৃদ্ধ মা-বাবার ভরণপোষণের জন্য ছেলেরা যৎসামান্য যা দেন, তা দিয়ে কোনো রকমে দিন চলে এই দম্পতির। বিবাহিত মেয়েরাও আছেন তাদের নিজেদের সংসারে। টানাপোড়েনের এই জীবনে একটু ভালোভাবে থাকার আশায়, মাথা গোঁজার একটা পাকা ছাদ তৈরি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন নমীতা।
মাসখানেক আগে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি ছোট ঘর নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। সেই ঋণের বিপরীতে প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার ৮০০ টাকা করে কিস্তি পরিশোধ করতে হতো তাকে। কষ্টের সংসারেও নিয়মিত কিস্তির টাকা গুছিয়ে রাখতেন। 
কিন্তু সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা তাদের সেই সাধের ঘরটি পুরোপুরি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এখন স্বামী আর বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন নমীতা।
ধূপীপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে শুধু প্লাবনে তলিয়ে যাওয়ার ক্ষতচিহ্ন। বন্যার পানি কিছুটা কমলেও এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন নমীতা ধূপী। 
তিনি বলেন, ঘরই নাই, থাকার জায়গা নাই। খাবার পর্যন্ত এখনো কেউ এখানে দিয়ে যায়নি, খুব কষ্টে আছি। এই দুঃসময়েও মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরের দিকে কিস্তির টাকা নিতে বাড়িতে হাজির হয়েছেন এনজিও কর্মী। যেখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই নাই, খাওয়ার ব্যবস্থা নাই, সেখানে আমি কিস্তির টাকা এখন কোথায় পাব? তারা কি মানুষ না? তারা বলে গেছে আগামীকাল আসবে।  
নমীতার এই কষ্ট শুধু তার একার নয়, পুরো ধূপীপাড়া গ্রামের বন্যাদুর্গত মানুষের। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রতিবেশীরা এনজিওগুলোর এমন কঠোর ও অমানবিক আচরণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। 
তারা জানান, এবারের প্রলয়ংকরী বন্যায় বাঁশখালীর এই এলাকার বহু পরিবারের ঘরবাড়ি লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। মানুষ এখনো ঠিকমতো দু-মুঠো চাল জোগাড় করতে পারছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এমন বড় মানবিক বিপর্যয়ের মুখে যেখানে মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত, সেখানে এনজিওগুলোর এমন চাপ সৃষ্টি করা চরম অন্যায়। অন্তত আগামী কয়েক মাসের জন্য সব ধরনের ঋণের কিস্তি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেন তারা। একই সঙ্গে দুর্গতদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি জরুরি ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা বাড়ানোরও জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য সংশ্লিষ্ট এনজিওর স্থানীয় শাখা ব্যবস্থাপকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। 

বাংলাধারা/.ডেক্স

মন্তব্য করুন