বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৭ ঘন্টা আগে, ০৫:০৪ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

‘সন্তান-স্বজন হত্যার বিচার চাই’, জুলাই শহীদ পরিবারের আর্তনাদ

ছবি: সংগৃহিত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও বিচার দৃশ্যমান হয়নি। অনেক পরিবার একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। সরকারের কাছে দ্রুত বিচার ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর সহায়তার দাবি জানিয়েছেন তারা।

শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ এসব দাবি তুলে ধরেন শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধারা। ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সম্মেলনে শতাধিক শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত আন্দোলনকারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও বেদনার কথা তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে স্বজন হারানোর শোক, বিচারহীনতার ক্ষোভ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা। অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পুরো মিলনায়তাজুড়ে সৃষ্টি হয় শোকাবহ পরিবেশ।

শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আব্দুল রব মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, জুলাই মাস এলেই তার সন্তানের স্মৃতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তিনি অভিযোগ করেন, ৫ আগস্ট তার ছেলে গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনার বিচার চেয়ে তিনি বলেন, শুধু তার সন্তানের নয়, জুলাই আন্দোলনে নিহত প্রত্যেকের হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন আর খালি না হয়। একই সঙ্গে তিনি আহত আন্দোলনকারীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, তার ভাইয়ের আত্মত্যাগ অনেক তরুণকে আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু অনেক শহীদ পরিবার আজও অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছে। তিনি এসব পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সারা দেশে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।

শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, বড় ছেলে নিহত হওয়ার পর ছোট ছেলের ক্যানসার ধরা পড়ে। সে সময় তিনি নানা জায়গায় সহায়তা চাইলেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। বর্তমানে সব শহীদ পরিবারের জন্য সমানভাবে সহযোগিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

শহীদ আলভীর বাবা আবুল হাসান অভিযোগ করেন, দুই বছর পার হলেও হত্যাকাণ্ডের বিচার দৃশ্যমান হয়নি। তিনি বলেন, বিচার নিশ্চিত করার আশাতেই শহীদ পরিবারগুলো এখনও অপেক্ষা করছে।

সম্মেলনে বক্তব্য দেন আহত জুলাই যোদ্ধারাও। আন্দোলনে দুই পা হারানো শাহীন মালু বলেন, তার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা জীবদ্দশায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার দেখে যাওয়া। একই সঙ্গে আহতদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

আহত আন্দোলনকারী মিল্লাত হোসেন বলেন, আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসা পেতে চরম দুর্ভোগের শিকার হন। তার ভাষায়, শুধু আন্দোলনে আহতরাই নন, তাদের পরিবারও দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মধ্যে পড়েছে। তিনি সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

আহত সুজন মোল্লা বলেন, আন্দোলনের উদ্দেশ্য সফল হলেও শহীদদের হত্যার বিচার এখনো শেষ হয়নি। তিনি দ্রুত বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।

আরেক আহত আন্দোলনকারী আল আমিন বলেন, আন্দোলনে হাত হারানোর পরও তিনি এখনো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না। তার মতো আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

জুলাই যোদ্ধা মেহেদী হাসান মিরাজ অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি প্রয়োজনীয় সহায়তা পাননি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনেককে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ সম্মেলন শুরু হয় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। পরে শহীদদের স্মরণে দোয়া ও মোনাজাত, জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং জুলাই আন্দোলনভিত্তিক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে ‘জুলাই স্মৃতি স্মারক’ তুলে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে একটি স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে মন্ত্রিসভার সদস্য, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।


বাংলাধারা/শারমিন

মন্তব্য করুন