বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৮:০৯ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

গাইবান্ধায় তিস্তার আকস্মিক ভাঙনে ৮৩ পরিবারের বসতভিটা বিলীন

ছবি; সংগৃহিত

গাইবান্ধায় ফের ভাঙনের কবলে পড়েছে সুন্দরগঞ্জের কাপাশিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ভোরের পাখি (লালচামার) এলাকা। গতকাল বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ৩টার দিকে তিস্তা নদীর আকস্মিক ভাঙনের তীব্রতায় নদীতে নিমিশেই বিলীন হয়ে গেছে ৮৩টি পরিবারের বসতভিটা। এর মধ্যে ১২টি পরিবারের অন্তত সাতটি টিনের ঘর পুরোপুরি নদীতে তলিয়ে গেছে এবং কয়েকটি ঘরের আংশিক অংশ ডুবে গেছে নদীতে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাওয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি ঢাকা পোস্টকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 
সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাত ৩টার দিকে হঠাৎ ভোরের পাখি বিদ্যালয়ের উত্তরপাশে ভাঙন শুরু হয়। ভাঙনের তীব্রতা এতোটাই ছিলো যে ওই রাতে নিমিশেই এখানকার ৬০টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়। পরে সকাল হতে হতে বসতভিটা বিলীন হওয়া পরিবারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৩।  ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে ১২টি পরিবারের ৭টি টিনের ঘর পুরোপুরি নদীতে তলিয়ে যায়। এ সময় ভাঙনের তোড়ে কিছু পরিবারের ঘরবাড়ি আংশিক ভেঙে নদীতে পড়ে। এ সময় তাদের গাছ-গাছালি ও হাঁস-মুরগির ঘরসহ হাঁস-মুরগিও নদীতে পড়ে নদীতে বিলীন হওয়া গাছ-গাছালি এবং খড়কুটোতে আশ্রয় নেয়।
এছাড়াও ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও অন্তত দুই শতাধিক পরিবার। এসব পরিবারে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা জানান, যদিও গতকাল থেকে পানি কিছুটা বাড়ছে কিন্তু তার আগে পানির পরিমাণ অনেকটা কমের প্রভাবে এই ভাঙন তীব্র হচ্ছে। 
ভাঙনের কবলে পড়া ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চলমান বর্ষা মৌসুমে কয়েক দফায় এই এলাকাটি ভাঙনের কবলে পড়ে। অন্তত চার দফা তীব্র ভাঙনের সর্বশেষ গত ১৮ আগস্ট নদীতে বিলীন হয় এখানকার চরের শিশুদের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
এর আগে গত ১৬ জুলাই দুপুরে সেখানে আকস্মিক ভাঙন দেখা দেয়। ওইদিনও অল্প সময়ের ব্যবধানে অন্তত ১০০ এর কাছাকাছি পরিবারের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়। 
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙনের এসব খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এমনকি গত ৮ আগস্ট পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে বিদ্যালয়টিসহ ভাঙন এলাকার বসতিদের রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
তাদের অভিযোগ, পরিমাণ মতো জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে এমন ভাঙন দেখতে হতো না তাদের। পাউবোর কাছে বারবার অনুরোধ জানালেও তারা কোনো কর্ণপাত করেনি।
কাপাশিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাফিজুল ইসলাম দুপুরে ভাঙনস্থল থেকে ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই এলাকায় বর্ষার শুরু থেকই ভাঙন চলছে। গতকাল রাত ৩টার দিকে তীব্র ভাঙন শুরু হয়। নিমিশেই ৮৩টি পরিবারের বসতভিটা, গাছপালা এমনকি তাদের খোঁয়াড়সহ হাঁস-মুরগিও নদীতে ভেসে গেছে। 
এ সময় তিনি আরও জানান, ভাঙনের মুখে আরও দুই শতাধিক পরিবার রয়েছে। ভাঙন রোধে পর্যাপ্ত জিও ব্যাগ ডাম্পিং করতে হবে। পানি উন্নয়নবোর্ড কাজ শুরু করেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি ঢাকা পোস্টকে বলেন, সকালে ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে।  সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙন কবলিতদের মাঝে শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে কাজ শুরু করেছে পাউবো।
তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তালিকা করা হলে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, সকালে ভাঙনের খবর পেয়েই জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যাক জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হবে।
এ সময় স্থানীয়দের অভিযোগ প্রশ্নে এই প্রকৌশলী বলেন, এসব ইমার্জেন্সি জরুরি কাজ। জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলে তো কাজের অনুমতি পাওয়া যায় না। যখন ভাঙন ধরে তখন কাজের অনুমতি পেয়ে কাজ করা হয়। 
গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৬২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়াও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৫৪ সেন্টিমিটার, ঘাঘট নদীর পানি জেলা শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ২১৮ সেন্টিমিটার এবং করতোয়ার পানি গোবিন্দগঞ্জের চকরহিমাপুর স্টেশন পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৫০৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে পাউবোর প্রতিদিনের পানি বৃদ্ধি-কমের তথ্য বিশ্লেষে দেখা গেছে, চলতি সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনই কমছিল জেলার সবগুলো নদ-নদীর পানি। তবে গেল রাত থেকে বাড়তে থাকে। এর আগে গত ১৯ জুলাই তিস্তার পানি কমে বিপৎসীমার ১০০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো। এছাড়া এ নদীর পানি গত ২৯ জুন ও ১৪ জুলাই দুই দফায়  বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই হয়ে বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। যদিও গাইবান্ধায় কোনো নদ-নদীর পানিই এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।

বাংলাধারা/ডেস্ক

মন্তব্য করুন