প্রকাশিত: ৫১ মিনিট আগে, ০৬:৫৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ চলাকালে ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় দুর্ঘটনায় নিহত সেনাসদস্য আবু বকর সিদ্দিক পিয়াসের জানাজা ও দাফন নোয়াখালীর কবিরহাটে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে কবিরহাট উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের মালিপাড়া গ্রামের মুন্সী সর্দার বাড়ির সামনে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে সামরিক মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে পিয়াসের মরদেহ মাইজদী শহীদ বুলু স্টেডিয়ামে আনা হয়। সেখান থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নেওয়া হয় তার গ্রামের বাড়িতে। পরিবারের সদস্যদের শেষবারের মতো দেখানোর পর জানাজার জন্য মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়।
পিয়াসের জানাজায় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতারা, সেনাবাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। স্বজনদের আহাজারি ও কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
নিহত আবু বকর সিদ্দিক পিয়াস নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মালিপাড়া গ্রামের আব্দুল ওয়াহাবের ছেলে। চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র ভাই। ছোটবেলা থেকেই শান্ত, ভদ্র ও অমায়িক স্বভাবের পিয়াস সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। সহজ-সরল ব্যবহারের কারণে স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন পিয়াস। ২০২৩ সালে বিয়ে করেন। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে চট্টগ্রামের সেনা কোয়ার্টারে বসবাস করতেন তিনি। তার রয়েছে মাত্র ১৮ মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান।
প্রশিক্ষণের মাঠে হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় পিয়াসসহ দুই সেনাসদস্য নিহত হন। এ ঘটনায় এক সেনা কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়ে ঢাকার সিএমএইচে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
পিয়াসের আকস্মিক মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন তার বাবা-মা ও স্ত্রী। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাবা আব্দুল ওয়াহাব ও মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্বামীকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ তার স্ত্রীও। মাত্র ১৮ মাস বয়সী মেয়েটি এখন বাবার স্মৃতি নিয়েই বড় হবে।
স্বজনেরা জানান, পরিবারের জন্য একটি পাকা ঘর নির্মাণের স্বপ্ন ছিল পিয়াসের। নিজের হাতে মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সুন্দর একটি ঘরে থাকার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই দেশের সেবায় নিয়োজিত অবস্থায় তাকে চলে যেতে হলো না ফেরার দেশে।
দেশের সেবায় জীবন দেওয়া এই তরুণ সেনাসদস্যের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যে পাকা ঘরটি একদিন নিজের হাতে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন পিয়াস, সেই স্বপ্ন আজ অপূর্ণ। তার বদলে গ্রামের মাটিতে দাদা-দাদির পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়ে রইলেন তিনি—পরিবারের হৃদয়ে রেখে গেলেন গভীর শূন্যতা, আর ১৮ মাসের ছোট্ট মেয়ের জন্য রেখে গেলেন বাবার অসংখ্য স্মৃতি।
পিয়াসের বন্ধু আকরাম বলেন, পিয়াস শুধু আমার বন্ধু ছিল না, সে ছিল আমার ভাইয়ের মতো। সব সময় হাসিমুখে থাকত, কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে দেখিনি। দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এভাবে চলে যাবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। ওর ছোট মেয়েটার মুখের দিকে তাকালে বুকটা ফেটে যায়।
পিয়াসের চাচাতো ভাই হারুন বলেন, পিয়াস ছিল আমাদের পরিবারের সবার আদরের মানুষ। চার বোনের একমাত্র ভাই হওয়ায় সবার কাছেই সে ছিল খুব প্রিয়। পরিবারকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। বিশেষ করে স্ত্রী-সন্তান ও মা-বাবাকে ভালোভাবে রাখার জন্য সে সব সময় চিন্তা করত। কিন্তু এত অল্প বয়সে এভাবে চলে যাবে, সেটা আমরা কেউ কল্পনাও করিনি।
পিয়াসের ভগ্নিপতি আবু সাঈদ বলেন, পিয়াস চার বোনের একমাত্র ছোট ভাই ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি শান্ত ও সহজ-সরল স্বভাবের ছিলেন। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন এবং তার অমায়িক ব্যবহারের কারণে তিনি সবার কাছে খুব প্রিয় ছিলেন।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন অসহায় হয়ে পড়েছে পিয়াসের পরিবার। তার স্ত্রী, ছোট্ট সন্তান, মা-বাবা ও স্বজনদের জীবনে নেমে এসেছে গভীর শূন্যতা।
পিয়াসের বাবা আব্দুল ওহাব বলেন, ছেলেটার অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই ছেলের লাশ আমার কাঁধে। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। এছাড়াও সংসারের কষ্ট দূর করার অনেক স্বপ্ন ছিল তার। পাকা ঘর আর হলো না, তার আগেই আমার ছেলেটা আমাদের ছেড়ে চলে গেল। এখন ঘর দিয়ে কী হবে, আমার ছেলেটাই তো আর নেই।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন