প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ১১:০২ এ এম
অনলাইন সংস্করণ
একে একে মুখ খুলছেন চাক্ষুষ সাক্ষীরা। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণও শেষের দিকে। ঠিক তখনই বদলে গেল মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের ট্রাইব্যুনালে আসার দৃশ্য। এতদিন স্বাভাবিকভাবে আনা হলেও এখন হাতে উঠেছে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট আর শরীরেও পরানো হচ্ছে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। তবে এর পেছনে শুধু নিরাপত্তাজনিত কারণ নয়, রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য। সাক্ষীদের বয়ানে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসার পাশাপাশি নতুন করে নিরাপত্তা-উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে একটি সূত্র। সূত্রটির দাবি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনা-নেওয়ার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে ব্রাশফায়ার করে পালানোর পরিকল্পনা ছিল জিয়াউলের।
তথ্য বলছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলায় আসামি হিসেবে রয়েছেন জিয়াউল আহসান। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় করা মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে। এ মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া থেকে শুরু করে জিয়াউলের দেহরক্ষী ইমরুল কায়েসও সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের শিকার আলকাছ মল্লিকের ভাই আব্বাস মল্লিকও ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেছেন ঘটনার বীভৎস বিবরণ। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন ১০ জন। তাদের জবানবন্দিতে যেন একে একে খুলছে গুম-খুনের অন্ধকার অধ্যায়ের পাতা। প্রতিটি সাক্ষ্যের সঙ্গে সামনে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, শতাধিক গুম-খুনের এ মামলায় এরই মধ্যে জবানবন্দি দিয়েছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। বিশেষত দেহরক্ষী, র্যাবের সিওসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জবানবন্দির পর জিয়াউলকে ঘিরে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়। স্যাবোটাজ বা নাশকতার উদ্দেশ্যে সম্ভাব্য কোনো পরিকল্পনা নিয়েও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য পেয়েছে বলে জানা গেছে।
দায়িত্বশীল একটি সূত্রের দাবি, নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো পুলিশ সদস্যের ভারী অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড করার পরিকল্পনা করছিলেন জিয়াউল। ব্রাশফায়ার করে পালানোর পরিকল্পনাও ছিল তার। এছাড়া জিয়াউল আহসানের কাছে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের কারণে অন্য পক্ষেরও তাকে টার্গেট করার আশঙ্কা রয়েছে। এমন গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর গত সপ্তাহে প্রসিকিউশন টিমের সঙ্গে বৈঠক করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। এরপর ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়।
জানা গেছে, অন্য বন্দিদের হাতকড়া পরিয়ে আনলেও কেরানীগঞ্জ বিশেষ কারাগার থেকে এতদিন স্বাভাবিকভাবেই জিয়াউলকে ট্রাইব্যুনালে আনা হতো। প্রিজনভ্যান থেকে নামিয়ে হাজতখানায় নেওয়ার সময় মামলাসংক্রান্ত নথিপত্র নিজের হাতেই বহন করতেন তিনি। পাশে থাকতেন দু-একজন পুলিশ সদস্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। তাকে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যও নিয়োজিত করা হয়। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে তাকে এভাবেই আনা শুরু হয়েছে।
শুধু ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা নয়, গুমের মামলার গুরুত্বপূর্ণ ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। সূত্রটির দাবি, জিয়াউলের অপকর্ম নিয়ে ট্রাইব্যুনালের সামনে মুখ খোলার পর একাধিক সাক্ষীর বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা। কোনো কোনো সাক্ষীর সন্তানরা স্কুল-কলেজে যাওয়া-আসা করছেন কি না, কোথায় যাচ্ছেন—এসব তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবি সূত্রটির। গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে এমন তথ্য পাওয়ার পর সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়েও নজর দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ মামলায় সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, সাক্ষীদের জবানবন্দিতে এরই মধ্যে জিয়াউল আহসানের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত আরও একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম সামনে এসেছে। তিনি যুক্তরাজ্যে থাকা জিয়াউলের সম্পত্তি দেখাশোনা করেন বলে তথ্য এসেছে। এছাড়া এ মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তিকে জিয়াউলের পরিবারের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা। কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে করে জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে আনার কিছু চিত্র বিশ্লেষণ করেছে ঢাকা পোস্ট। ৩১ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর—টানা চারদিন তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এর মধ্যে গুমের মামলায় (আইসিটি বিডি মামলা নম্বর ৯/২০২৫) সাক্ষ্যগ্রহণের নির্ধারিত দিন ছিল ৩১ আগস্ট। এদিন আগের মতোই জিয়াউলকে প্রিজনভ্যান থেকে নামিয়ে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নেওয়া হয়। তার পরনে ছিল নীল ট্রাউজার আর আকাশি রঙের টি-শার্ট। হাতে কোনো হাতকড়া ছিল না। তার দুই পাশে ছিলেন দায়িত্বরত দুজন পুলিশ সদস্য। তবে সাক্ষ্য না হওয়ায় ১ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল-১।
১ সেপ্টেম্বরও (মঙ্গলবার) জিয়াউলকে আনা হয়। তবে সেদিনের দৃশ্যপট ছিল পুরো ভিন্ন। অন্য আসামিদের মতোই তাকে হাতকড়া পরিয়ে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নেওয়া হয়। শরীরে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট বা ভেস্ট না থাকলেও তার দুই হাতে হাতকড়া পরানো অবস্থায় দেখা গেছে। ঠিক একদিন পর ২ সেপ্টেম্বর (বুধবার) আরও পরিবর্তন দেখা যায়। গুমের মামলায় দশম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ থাকায় সকালেই হাজির করা হয় জিয়াউল আহসানকে। এদিন প্রিজনভ্যান থেকে হাজতখানা পর্যন্ত দুই পাশ ঘিরে রেখেছিলেন পুলিশ সদস্যরা। প্রিজনভ্যান থেকে নামানোর সময় তার গায়ে ভেস্ট ও সামনে রাখা দুই হাতে হাতকড়া পরানোর দৃশ্য চোখে পড়ে। এছাড়া আগে-পিছে ছিলেন বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য।
৩ সেপ্টেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেক মামলায় একইভাবে আনা হয় তাকে। এদিন জিয়াউলের দুই হাত পিছমোড়া করে হাতকড়া পরানো ছিল। গায়ে ছিল ভেস্ট ও মাথায় হেলমেট। যদিও এসব বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন জিয়াউল আহসান। ২ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেকে ‘সবার টার্গেট’ উল্লেখ করে সুবিচারও চেয়েছিলেন তিনি।
জিয়াউল জানান, সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালে প্রশিক্ষণের সময় কোমর ও ঘাড়ে ব্যথা পেয়েছেন। এ অবস্থায় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনার সময় হাতকড়া, হেলমেট ও ভেস্ট পরালে তার সমস্যা হয়। এজন্য এসব থেকে অব্যাহতি চান তিনি।
নিরাপত্তাজনিত কারণেই এভাবে আনা হচ্ছে বলে সেদিন ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তখন জিয়াউল বলেন, প্রিজনভ্যান থেকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানার দূরত্ব মাত্র পাঁচ গজ। তাকে নামানোর সময় প্রায় ২০ জন পুলিশ সদস্য থাকেন। ওই সময় বিচারক মন্তব্য করেন, ‘পাঁচ গজ নয়, এক গজ থেকেও কেউ চাইলে স্নাইপারে টার্গেট করতে পারেন।’ অবশ্য সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা জানান, ট্রাইব্যুনালে নিরাপত্তা অনেক বেশি। তাই তাকে টার্গেট করার সুযোগ নেই। পরে হাতকড়া ও ভেস্ট থেকে অব্যাহতি চেয়ে তাকে লিখিত আবেদন করার পরামর্শ দেন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চ।
একই দিন জিয়াউল আহসানের আইনজীবী নাজনীন নাহার ঢাকা পোস্টকে বলেন, হাতকড়া ও ভেস্ট থেকে অব্যাহতি চেয়ে আমরা অবশ্যই আবেদন করব। কিন্তু প্রসিকিউশন কী চায়, সেটিই দেখার বিষয়। এখানে তারা যা চায় তা-ই হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বিশেষ কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার তায়েফ উদ্দিন মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এটা আমার জানা নেই। কারণ আমরা পুলিশের কাছে এসকর্ট চাই, পুলিশ কীভাবে নিয়ে যাবে সেটা পুলিশ জানে। হয়তো নিশ্চয়ই তাদের কোনো কনসার্ন থাকতে পারে। আমার জানা নেই।’
জিয়াউল আহসানের আচরণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো পরিবর্তন দেখছি না। কারাগারে আসার পর যেমন ছিল তেমনই রয়েছে। কোনো উগ্র বা ওরকম কিছু দেখিনি। যেরকম ছিল একই রকম রয়েছে।’
এ বিষয়ে ১ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, কাকে হাতকড়া পরানো হবে বা হবে না, তা জেল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কীভাবে আসামিকে আদালতে নিয়ে আসবেন, সেটা একান্তই তাদের ব্যাপার। এখানে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। যদি তার প্রতি আচরণের কোনো ব্যত্যয় ঘটে থাকে বা ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেআইনি কাজ করে, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেবো।
গুমের মামলায় জিয়াউল আহসানকে ইদানিং হাতকড়া-ভেস্ট পরিয়ে কেন আনা হচ্ছে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, এক কথায় আমাদের ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। কারণ যখনই বিভিন্ন প্রভাবশালী আসামিদের বিরুদ্ধে বিচারকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে কিংবা রায়ের অপেক্ষমাণ থাকে, ঠিক সেই মুহূর্তে এখানে কোনো স্যাবোটাজ করার প্রক্রিয়া থাকতে পারে বলে আমাদের কাছে গোপন তথ্য রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যারা ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তায় কাজ করেন, তাদের কড়াকড়ির জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন