প্রকাশিত: ৫১ মিনিট আগে, ০৬:৩০ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
‘আমি সেদিন বাসা থেকে বের হয়েছিলাম পুরোপুরি জীবনের অনিবার্য ঝুঁকি নিয়েই- হয় মরবো, না হয় বাঁচবো মাথা উঁচু করে।’ ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি স্মরণ করে নিজের অদম্য মানসিকতার কথা এভাবেই ব্যক্ত করেন নেত্রকোণার তরুণী সোমাইয়া আক্তার মিতু।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ৪ আগস্ট নেত্রকোণা শহরের কুরপাড় এলাকায় একদফা দাবিতে অংশ নিয়ে মারাত্মক হামলার মুখে পড়েন ২৪ বছর বয়সী এই তরুণী। আত্মরক্ষার্থে দৌড়ে একটি দোকানে আশ্রয় নিতে গেলে ওপর থেকে পড়ে যাওয়া শাটারের তীব্র আঘাতে তার কোমর ও মুখের চোয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসকদের মতে, কোমরের পিএলআইডি (চখওউ) এবং চোয়ালের জয়েন্টের জটিলতার পাশাপাশি থ্যালাসেমিয়া মাইনরজনিত শারীরিক সমস্যার কারণে বর্তমানে হুইলচেয়ারেই থমকে গেছে তার স্বাভাবিক চলাচল। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও দীর্ঘ চিকিৎসার চরম আর্থিক ভোগান্তি সত্ত্বেও অসীম আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া নতুন বাংলাদেশে বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গড়ার স্বপ্নে অবিচল রয়েছেন তিনি।
নেত্রকোণা শহরের বাসিন্দা প্রয়াত মোফাজ্জল হোসেন ও রেহেনা খানমের সন্তান সোমাইয়া আক্তার মিতু। ৮ বোন ও ৫ ভাইয়ের বিশাল পরিবারে বেড়ে ওঠা মিতু ২০১৭ সালে দত্ত উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৯ সালে নেত্রকোণা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। শৈশবে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও পিতৃহীন পরিবারের আর্থিক বাস্তবতায় তা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে ২০২১ সালে সরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে সফলভাবে সম্পন্ন করেন ‘ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি’ কোর্স। মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগের লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হওয়া এই তরুণী ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদ ও ওয়াসিম আকরামের রক্তাক্ত ছবি দেখে ঘরে বসে থাকতে পারেননি। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে রাজপথ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার হয়ে ওঠেন তিনি।
প্রতিবাদের এই কঠিন যাত্রায় নানা হুমকি ও ছাত্রলীগের হেনস্তার মুখে পড়লেও পরিবারের সদস্যরা একপর্যায়ে মিতুর পাশে এসে দাঁড়ান। মিতুর এই দূরন্ত পথচলার বিষয়ে তার সহোদর বড় বোন কবি, লেখক ও উন্নয়নকর্মী তহুরা আক্তার বলেন, ‘মিতু শুধু আমার ছোট বোন নয়; সে আমাদের পরিবার ও নতুন প্রজন্মের সাহস ও প্রতিবাদের এক জীবন্ত প্রতীক। আন্দোলন চলাকালে ওর নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ ছিল, নানা হুমকি-ধমকিও এসেছে। কিন্তু ওর অদম্য জেদ আর সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মানসিকতা দেখে আমরা পিছু হটতে পারিনি। আমরা ওকে বলেছিলাম- ‘তুমি সবার মতো ন্যায্য প্রতিবাদ চালিয়ে যাও।’ আজ হুইলচেয়ারে থমকে গেলেও ওর চিন্তার স্বাধীনতা ও স্বপ্নের জায়গায় ও একটুও হারেনি। আমরা চাই সে দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার নিজের পায়ে দাঁড়াক।’
একইসঙ্গে মিতু জানান, তার বড় বোন তহুরা আক্তারের নিবিড় ছায়ার পাশাপাশি তহুরার স্বামী কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক স্বাধীন চৌধুরীর মুক্তচিন্তা, সততা, প্রগতিশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক শক্তিকে আরও মজবুত করেছে।
২০২৪ এর ৪ আগস্ট জেলা শহরের কুরপাড় এলাকায় গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে মিতুর স্বাভাবিক চলাফেরার সক্ষমতা কমতে থাকে। এ পর্যন্ত চিকিৎসায় পরিবারের প্রায় ৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ৫ আগস্টের পর সহযোদ্ধাদের সঙ্গে শহরের বিভিন্ন দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিলেও পরবর্তীতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত সুবিধা নিতে চাওয়া সুযোগসন্ধানী ভুয়া আন্দোলনকারীদের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কথা বলায় নতুন করে সাইবার বুলিং ও হেনস্তার শিকার হতে হয় তাকে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় সাবাবা হক ও প্রাপ্তিসহ তাদের মতো সক্রিয় নারী শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো অপপ্রচারের বিষয়ে স্থানীয় সেনাক্যাম্পে লিখিত অভিযোগ জানালে কর্তৃপক্ষ অভিযুক্তদের ডেকে এনে মিতুর সামনে ক্ষমা চাওয়ায় এবং ভবিষ্যতে হেনস্তা না করার লিখিত অঙ্গীকার নেয়।
নিজের শারীরিক কষ্ট ও আন্দোলনের অবদানকে কোথাও বিক্রি না করে নীরব থেকে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া এবং জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার না করার এই বিরল দৃষ্টান্ত সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেন নিশাত তাবাসসুম প্রাপ্তি।
বিষয়টি সিএমএইচে আহতদের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বরত সিনিয়র প্রতিনিধি নুসরাত জাহানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে পৌঁছালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সিএমএইচে মিতুর উন্নত চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা হয়।
এ বছর ২০২৬ এর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ আমন্ত্রণে যোগ দিলে সময়সূচির কারণে বক্তব্য বাদ পড়লেও বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে প্রত্যক্ষ করেন এবং পরবর্তীতে মিতুকে ডেকে নেন।
প্রধানমন্ত্রী তার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়ে বলেন, ‘সোমাইয়া, তোমার শরীরের কী অবস্থা এখন? তোমার কথা তো অনেক শুনলাম!’ জবাবে মিতু বলেন, ‘খানিকটা উন্নতি হলে আবার অবনতি হয়, এভাবেই চলছে সিএমএইচে চিকিৎসা। দেখা যাক, আল্লাহ ভরসা।’ তখন প্রধানমন্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমি সেনাপ্রধানকে বলে দিয়েছি তোমার সকল প্রকার চিকিৎসা যেন সঠিকভাবে চলে সে ব্যবস্থা নিতে। তোমার উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাহিরে যেতে হলে আমি আমার নিজের অর্থায়নে বাহিরে পাঠাবো, চিন্তা করো না।’
প্রধানমন্ত্রীর এই আশ্বাসের জবাবে মিতু নিজের ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে দেশ ও নারীদের নিরাপত্তার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘ধন্যবাদ স্যার, লাগবে না। আপনাদের দোয়া চাই এবং একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, একজন নারী হিসেবে আমাদের নিরাপত্তা চাই।
তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর নতুন বাংলাদেশ তো আমরা এমন চাইনি, যেখানে নারীদের নিরাপত্তা দিন দিন কমতে শুরু করবে কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে হবে। আমরা নারীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি খেটে খাওয়া দিনমজুর মানুষের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিশ্চয়তাটুকু চাই।” উত্তরে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, সব হবে। তোমার চিকিৎসা তো একটা লম্বা প্রসেস, তাই এমআইএস (গওঝ) প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে। এটা লাগবেই। আগে তুমি সুস্থ হও, এরপর আবার একসাথে বসে তোমার কথা শুনবো।’
সাক্ষাৎকালে এক অনন্য হৃদ্যতাপূর্ণ মুহূর্তের সৃষ্টি হয়, যখন প্রধানমন্ত্রীর কন্যা জাইমা রহমান বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মিতুর সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিক ও সহজ-সরলভাবে কুশল বিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মানবিক উদ্যোগ ও খোঁজখবর রাখার বিষয়ে মিতু বলেন, ‘যে বৈষম্যহীন মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা এখনো পুরোপুরি হয়ে ওঠেনি। আমি সেই বাংলাদেশের অপেক্ষাতেই আছি।’ সিএমএইচে চিকিৎসাধীন মিতু সুস্থ হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, চাকরি এবং পিছিয়ে পড়া নারীদের কল্যাণে কাজ করার অদম্য প্রত্যয় নিয়ে আজও পথচেয়ে আছেন সেই স্বপ্নের বাংলাদেশের দিকে।
বাংলাধারা/ডেস্ক
মন্তব্য করুন