ঢাকা, রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত:

হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা, তেলের বাজারে অস্থিরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: মার্চ ০৭, ২০২৬, ১০:১৬ রাত  

ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের চলমান উত্তেজনা এখন আর শুধু আঞ্চলিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এর প্রতিক্রিয়া দ্রুত দেখা যাচ্ছে। অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে, শেয়ারবাজারে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা এবং নতুন করে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ৯২ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই তেলের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ খাতে। কারণ আধুনিক অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং এর প্রভাব ধীরে ধীরে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামেও পড়ে।

বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়। কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এতে তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং অনেক শিপিং কোম্পানি নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এড়াতে এই পথ ব্যবহার করতে অনীহা দেখাচ্ছে। ফলে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ কমার আশঙ্কা তৈরি হলেই জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়- বর্তমান পরিস্থিতিতে ঠিক সেটিই ঘটছে।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও পড়েছে। মার্কিন ক্রুড তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৮০ ডলারে পৌঁছেছে এবং কিছু ক্ষেত্রে দাম প্রায় ১৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং এই অঞ্চলের যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব ফেলে।

জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটলেও শেয়ারবাজারে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে এবং কিছু বাজারে গত ছয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। সাধারণত যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে শেয়ার বিক্রি করে দেন। এতে বাজারে বিক্রির চাপ বাড়ে এবং সূচক নিচের দিকে নেমে আসে। বর্তমানে অনেক বিনিয়োগকারী নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন, যেমন স্বর্ণ বা মার্কিন ডলার।

জ্বালানির দাম বাড়ার অন্যতম বড় প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর। কারণ প্রায় সব শিল্প খাতেই জ্বালানির ব্যবহার রয়েছে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ও বাড়ে, যার ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে যদি জ্বালানির দাম আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নতুন করে মুদ্রানীতি নির্ধারণ করতে হতে পারে।

বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নিরাপদ মুদ্রার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এই প্রবণতার কারণেই বর্তমানে মার্কিন ডলার আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে, অন্যদিকে ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ডের মান কিছুটা কমে গেছে। ডলার শক্তিশালী হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, কারণ তাদের অধিকাংশ জ্বালানি ও কাঁচামাল ডলারে কিনতে হয়। ফলে এসব দেশের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির এই অস্থিরতা শুধু বড় কোম্পানি বা বিনিয়োগকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনেও। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি পায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করে। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে অনেক সময় পণ্যের দাম বাড়াতে হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা পরিচালনাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ইরান ও ইসরায়েলের এই সংঘাত এখন কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। জ্বালানি সরবরাহ, বৈদেশিক মুদ্রা বাজার এবং শেয়ারবাজার- সব ক্ষেত্রেই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং অনেক দেশকে তখন নতুন অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হতে পারে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক ইস্যু নয়; এটি ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতির বড় একটি অনিশ্চয়তায় পরিণত হচ্ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশই অনুভব করতে পারে।


বাংলাধারা/এসআর