বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১ ঘন্টা আগে, ০৯:০৪ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

‘স্বপ্ন’ থেকে ‘দুঃস্বপ্ন’- কর্ণফুলী টানেল এখন সরকারের আর্থিক বোঝা

ছবি: সংগৃহীত

দেশের প্রথম এবং দক্ষিণ এশিয়ার নদীর তলদেশে নির্মিত দীর্ঘতম সড়ক টানেল কর্ণফুলী টানেল একসময় ছিল বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের অন্যতম গর্বের প্রতীক। কিন্তু উদ্বোধনের আড়াই বছরের মাথায় সেই ‘স্বপ্নের প্রকল্প’ই এখন সরকারের জন্য বড় আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়েছে। টোল আদায়ের চেয়ে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বেশি অর্থ ব্যয় হওয়ায় প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং দুর্বল পরিকল্পনার বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে নির্মিত প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে আনোয়ারা প্রান্তকে যুক্ত করে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নতুন অর্থনৈতিক করিডোর সৃষ্টি করা। তবে প্রত্যাশার সেই সুফল এখনো মেলেনি।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষাতেই বড় ধরনের ভুল ছিল। সমীক্ষায় প্রতিদিন ১৭ হাজার ৩৭৫টি যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হলেও বর্তমানে টানেল ব্যবহার করছে মাত্র ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার যানবাহন। অর্থাৎ প্রত্যাশার মাত্র ২৩ থেকে ২৬ শতাংশ যানবাহন টানেল দিয়ে চলাচল করছে।

এই কম যান চলাচলের প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আয়ে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ লাখ টাকা টোল আদায় হলেও পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২২ লাখ টাকা। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকা এবং বছরে প্রায় ৩৬ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে টোল থেকে যে আয় হচ্ছে, তা পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৫৪ থেকে ৫৫ শতাংশ পূরণ করতে পারছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, টানেলের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও ‘সার্ভিস এরিয়া’ নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। প্রায় ৫০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই এলাকায় ৩০টি বাংলো, ভিভিআইপি স্যুট, অ্যাপার্টমেন্ট, সুইমিং পুল, জিম, অ্যাম্ফিথিয়েটারসহ নানা বিলাসবহুল স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, যার প্রয়োজনীয়তার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি প্রকল্প নথিতে পাওয়া যায়নি। বর্তমানে এসব স্থাপনা প্রায় পুরোপুরি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে।

আইএমইডি আরও জানিয়েছে, প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের পর্যাপ্ত নথিপত্র নেই। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ না করে অর্থ ছাড় করা হয়েছে। ল্যান্ডস্কেপিং ও বৃক্ষরোপণের নামে প্রায় ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ের উল্লেখ থাকলেও কোথায় কী কাজ হয়েছে, তার কোনো তথ্য প্রকল্পের নথিতে পাওয়া যায়নি। অডিটে এটিকে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বিধিবহির্ভূতভাবে শত শত কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ, অনুমোদন ছাড়াই ভেরিয়েশন অর্ডার, বিলম্বের জন্য জরিমানা আদায় না করা, জাল বিল-ভাউচার ব্যবহার, উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই কাজ বাস্তবায়ন এবং কর-ভ্যাট কম আদায়ের মতো নানা অনিয়মের তথ্যও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।

আর্থিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পের ডিসকাউন্টকৃত মোট আয় মাত্র ১১৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা, বিপরীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা। ফলে প্রকল্পটির নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু (এনপিভি) ঋণাত্মক ৯ হাজার ৭০৮ কোটি টাকার বেশি এবং বেনিফিট-কস্ট রেশিও মাত্র ০.০১২, যা প্রকল্পটির আর্থিকভাবে অলাভজনক হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

তবে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু সুপারিশও করেছে আইএমইডি। সংস্থাটি বলছে, ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন ও ডিজিটাল পেমেন্ট চালু, টোল হার যৌক্তিকভাবে পুনর্বিবেচনা, পণ্যবাহী ট্রাককে টানেলমুখী করতে বিশেষ কৌশল গ্রহণ এবং শাহ আমানত সেতুতে ওভারলোড যানবাহনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে টানেলের ব্যবহার বাড়তে পারে।

সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ জানিয়েছেন, টানেলের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে কীভাবে এটিকে লাভজনক করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করছে সরকার। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়কার অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে।

এদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক প্রকল্পটিকে ‘অতি উৎসাহী ও ভোগবাদী প্রকল্প’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রকল্প এলাকায় বিলাসবহুল বাংলো ও অবকাঠামো নির্মাণের কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। তিনি বলেন, যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

একসময় দেশের উন্নয়নের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত কর্ণফুলী টানেল এখন পরিকল্পনার দুর্বলতা, আর্থিক অনিয়ম এবং বাস্তবসম্মত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অভাবের একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই মেগা প্রকল্পের আর্থিক চাপ আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে।


বাংলাধারা/শারমিন
 

মন্তব্য করুন