বাংলাধারা রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৫৮ মিনিট আগে, ১০:৫২ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

গেমস যায় গেমস আসে, বদলায় না বাংলাদেশ

ছবি; সংগৃহিত

এশিয়ান গেমসের পর্দা নেমেছে গতকাল। সব দেশ পদকের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে। বাংলাদেশের মিলেছে একরাশ হতাশা।১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশ এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণ করছে। প্রতি গেমসের পরই হয় আলোচনা। পরের গেমসে শোধরানো ও উন্নতির আশা করলেও বাংলাদেশ থাকে সেই আঁধারেই। জাপানের আইচি-নাগোয়া ২০তম এশিয়ান গেমস কাভার শেষে ঢাকা পোস্টের সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার আরাফাত জোবায়ের বাংলাদেশ ও গেমসের নানা দিক তুলে ধরেছেন
২২ ডিসিপ্লিনের যৌক্তিকতা কি? 
মানদণ্ডে অলিম্পিকের পরই এশিয়ান গেমসকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এশিয়ান গেমসে এবার বাংলাদেশ ২২ ডিসিপ্লিনে অংশগ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের চেয়ে আর্থিকভাবে উন্নত অনেক দেশেও এত খেলোয়াড় ও এত ডিসিপ্লিনে অংশগ্রহণ করেনি। 

বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান রানার উপলব্ধি, ‘আমার কাছে মনে হয় সম্ভাবনাময় ও প্রশিক্ষণে রয়েছে এমন ডিসিপ্লিনগুলোকে গেমসে পাঠানো উচিত। এত সংখ্যক ডিসিপ্লিনে অংশগ্রহণ না করলেও হয়।’
এশিয়ান কিংবা কমনওয়েলথ গেমস আসলেই নিজ নিজ ফেডারেশন কোচ-খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা পাঠানোর জন্য অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। অনেক সময় অলিম্পিকের নীতি নির্ধারক কর্তাদের ইচ্ছেতেও ডিসিপ্লিনের সংখ্যা বাড়ে। এশিয়ান গেমসকে অনেক ফেডারেশন শিক্ষার অংশ হিসেবে নেয়। অলিম্পিকের নতুন মহাসচিব রানার প্রথম বড় গেমস পার করার পর তার মত দিলেন, ‘একজন কোচ-খেলোয়াড়ের অবশ্যই আগ্রহ থাকে এশিয়ান গেমসে খেলার জন্য। এশিয়ান গেমস ছাড়াও অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার, টিটি, ব্যাডমিন্টনসহ সকল খেলায় এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ হয়। সেই এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ফলাফল ও যারা অনুশীলনে থাকবে তাদেরই এশিয়ান গেমসে পাঠানো দরকার।’
নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার নিচে বাংলাদেশ
এশিয়ান গেমস মানেই চীনের একচ্ছত্র দাপট। এরপর কোরিয়া, জাপানের লড়াই মূলত দ্বিতীয় স্থানের। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একমাত্র ভারত শীর্ষ পাঁচে থাকে এশিয়ান গেমসে। 
বাংলাদেশের এশিয়ান গেমসের লক্ষ্য থাকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে থাকা। ভারত বাংলাদেশের চেয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কাছাকাছি থাকা নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। 
শ্রীলঙ্কা অ্যাথলেটিক্সে এক স্বর্ণ জিতে অনেক দেশকে পেছনে ফেলেছে। অ্যাথলেটিক্সের পাশাপাশি নারী ক্রিকেটে রৌপ্য আর পুরুষ ক্রিকেটে ব্রোঞ্জ জিতে তাদের ৩ পদকে অবস্থান ২৮। পাকিস্তানের মোট পদক দশ হলেও স্বর্ণ না থাকায় শ্রীলঙ্কার চেয়ে এক ধাপ নিচে ২৯। দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রীড়া অবকাঠামো দুর্বল নেপালের। সেই নেপালও বাংলাদেশের চেয়ে একটি ব্রোঞ্জ বেশি পেয়ে পদক তালিকায় এক ধাপ উপরে রয়েছে। 
আগামী বছর মার্চে এসএ গেমস রয়েছে। সেই গেমসের দিকে তাকিয়ে থাকে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা। এশিয়ান গেমসে নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে পেছনে থাকায় এসএ গেমসে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে এখনই শঙ্কা কাজ করছে। 
ক্রিকেটে হতাশা, লজ্জা ও নিবেদনের অভাব
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল ক্রিকেটকে ঘিরে। নারী ও পুরুষ উভয় দলই হতাশ করেছে। নারী ক্রিকেটের চেয়ে পুরুষ ক্রিকেটারদের চরম বাজে পারফরম্যান্স প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একদিকে মাঠে বাজে পারফরম্যান্স আরেকদিকে খেলোয়াড়দের এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ানোতে নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 
বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান রানা বলেন, ‘ক্রিকেট একাধিকবার খেলোয়াড় পরিবর্তন করেছে। তারা যখন যা চেয়েছে আমরা সেটাই করেছি শুধু পদকের আশায়। অথচ সেই পদক আসেনি। ক্রিকেটাররা চরম হতাশ করেছেন। গেমসে ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের সামগ্রিক বিষয়ে অলিম্পিক বিসিবিকে চিঠি দেবে।’
উশুতে ‘আল্লাহর দান’
বাংলাদেশের একমাত্র পদক এসেছে উশুতে। নারী ৫২ কেজি ওজন শ্রেণিতে জিন্নাত আক্তার সেমিফাইনালে উঠায় ব্রোঞ্জ জিতেছেন। তবে সেটা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ না খেলেই। প্রথম রাউন্ড তিনি বাই পেয়েছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে তার প্রতিপক্ষের ওজন বেশি হওয়ায় বাদ পড়েছেন। এতে তিনি সেমিফাইনালে উঠেন ও ব্রোঞ্জ জেতেন। 
কাবাডিতে আগেই উদযাপনে পদক মিস
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ডিসিপ্লিন কাবাডি। গত দুই গেমসে কাবাডিতে পদক আসেনি। এবার পুরুষ কাবাডিতে পদকের সম্ভাবনা ছিল। কোরিয়ার পর চাইনিজ তাইপেকে হারিয়ে বাংলাদেশ পদকের উদযাপন করে। কিন্তু জাপান ম্যাচ তাদের বাকি ছিল। স্বাগতিক জাপানকে দুর্বল ভেবে বাংলাদেশ তেমন গুরুত্ব দেয়নি। জাপানের কাছে হেরে বাংলাদেশ কঠিন সমীকরণে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের পরিবর্তে চাইনিজ তাইপে কাবাডিতে পদক পায়। নারী কাবাডিতেও বাংলাদেশ হতাশ করেছে, সেখানে নেপাল ব্রোঞ্জ জিতেছে। অথচ বাংলাদেশ নারী দল নেপালকে হারিয়েছিল ঢাকায়। 
আরচ্যারি, শুটিংয়েও হয়নি ফলাফল
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ডিসিপ্লিন শুটিং। এবার শুটিংয়ে বাংলাদেশ খুবই খারাপ পারফরম্যান্স করেছে। অনেক শুটার জাতীয় প্রতিযোগিতার চেয়েও কম করেছে। আরচ্যারি সারা বছর বিদেশি কোচের অধীনে অনুশীলন করে। এরপরও কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বাদ পড়েছেন অনেকে। 
ব্যাডমিন্টন বাংলাদেশে শীতকালে অনেক জনপ্রিয় খেলা। সেই খেলায় বাংলাদেশ এবারই প্রথম এশিয়ান গেমসে খেলেছে। প্রথম অংশগ্রহণে পুরুষ দ্বৈতে বাংলাদেশ প্রি কোয়ার্টারে উঠে। যা বাংলাদেশের ব্যাডমিন্টনের জন্য কিছুটা আশার আলো।
গেমসের মূল আকর্ষণ অ্যাথলেটিক্স, সাঁতার। অ্যাথলেটিক্সে ইমরানুর রহমান সেমিফাইনালে উঠেছিলেন। সাঁতারে মুক্তি খাতুন নিজের সেরা টাইমিংও করতে পারেননি। সাইক্লিং, কারাতেসহ আরও কয়েকটি ডিসিপ্লিন ছিল বাংলাদেশের জন্য শুধুই অংশগ্রহণ। 
প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই
ফুটবল, আরচ্যারি, ক্রিকেট ছাড়া অন্য সব ডিসিপ্লিনে এশিয়ান গেমসের জন্য অনুশীলন হয়েছে এক মাসের কম সময়। এত কম সময়ে অনুশীলনে পদক পাওয়া বা আশা করা বাতুলতা। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এই বিষয়ে বলেন, ‘এক মাসের অনুশীলনে এশিয়ান গেমস থেকে পদক পাওয়া সম্ভব নয় কোনোভাবেই। সম্ভাবনাময় ডিসিপ্লিন ও খেলোয়াড়দের ফেডারেশনকে অনুশীলনে রাখতে হবে। অনেক ফেডারেশনের দীর্ঘমেয়াদী অনুশীলনের সামর্থ্য নেই। তাদের জন্য সরকার থেকে ব্যবস্থা করা দরকার।’
অগোছালো গেমস ও বাংলাদেশের অপেশাদারিত্ব
জাপান বিশ্বের অন্যতম নিয়মতান্ত্রিক ও গোছালো দেশ হিসেবে স্বীকৃত। তবে এশিয়ান গেমসে জাপান সেটা দেখাতে পারেনি। বিশেষ করে নাগোয়ায় আবাসন সংকট ছিল চরম। বাংলাদেশের আরচ্যাররা একদিন নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। অন্য দেশের খেলোয়াড়েরাও আবাসন সমস্যায় ছিলেন ব্যাপকভাবে। সাংবাদিকরাও মিডিয়া শাটল সার্ভিস ঠিক মতো পায়নি। গেমসে যেখানে মিডিয়া সেন্টার থেকে প্রতি ভেন্যুতে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাস যাওয়ার রীতি সেখানে এবার জাপান সেই ব্যবস্থা করেনি। ফলে সময় ও অর্থের ব্যয় হয়েছে অনেক। এশিয়ান গেমসের অব্যবস্থাপনার জন্য সাংগঠনিক কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখও প্রকাশ করেছে। 
বাংলাদেশ এশিয়ান গেমসের শুরুতে আলোচনায় ছিল ব্যাডমিন্টনের জার্সির ভুল নিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাডমিন্টন ফেডারেশন শাটলারাদের জন্য এমন জার্সি বানিয়েছিল যা আন্তর্জাতিক রীতি নীতির বাইরে। এতে বাংলাদেশের খেলাই সংশয়ের মধ্যে পড়েছিল। পরবর্তীতে শাটলার আয়মান ইবনে জামান ইউনেক্সের সাথে আলোচনা করে জার্সি ব্যবস্থা করেন।

বাংলাধারা/ডেস্ক

মন্তব্য করুন