প্রকাশিত: ৫৪ মিনিট আগে, ১০:৫৬ এ এম

অনলাইন সংস্করণ

বাঁশির সুরে স্কুল শুরু, দেশসেরা প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস

ছবি; সংগৃহিত

প্রতিদিনের মতো ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৯টা। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে বাঁশি বাজিয়ে সারিবদ্ধভাবে শিক্ষার্থীদের ভেতরে প্রবেশ করাচ্ছেন তিনি। এরপর শুরু হয় শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও শারীরিক কসরত। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার পর শিক্ষকদের নিজ নিজ দায়িত্বে পাঠদানের জন্য শ্রেণিকক্ষে পাঠাচ্ছেন এবং প্রতিটি ক্লাসের খোঁজ নিচ্ছেন। তিনি হলেন জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতা-২০২৬-এ দেশের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক (মহিলা) নির্বাচিত নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের চূড়ান্ত মূল্যায়নে শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদান, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই গৌরবময় পদকে ভূষিত করা হয়। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি ১২ বার সোনারগাঁ উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক এবং আটবার নারায়ণগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়াও তিনি ঢাকা বিভাগে দুইবার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। 
ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে বি. আর. বিলকিস দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার সুনিপুণ পরিচালনায় বিদ্যালয়টি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বারবার প্রশংসিত হয়েছে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার কমানো, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
এই গৌরবময় অর্জনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বিআর বিলকিস বলেন, যেকোনো কাজের স্বীকৃতিই আনন্দের। এই অর্জন শুধু আমার একার নয়, এটি আমার বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সোনারগাঁ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। এই সম্মাননা আমাকে ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান আরও বৃদ্ধি করতে এবং শিশুদের মেধা বিকাশে আরও বেশি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।
তিনি ১৯৯৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরে পুনরায় পরীক্ষার মাধ্যমে ২০০৩ সালে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পান। তিনি সোনারগাঁয়ের সাদিপুর ইউনিয়নের কোনাবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উপজেলার পঞ্চমীঘাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং রাজধানীর লালমাটিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০২৬ সাল—দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ২০ জন। প্রতি রোববার ‘হ্যাপি সানডে’ পালন করা হয়। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ। বিদ্যালয়ে ১৩ জন শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ক্লাসেই বাস্তবায়ন করা হয়। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের মাধ্যমে বছরের শুরুতে তিন স্তরের শিক্ষার্থী বাছাই করা হয়—উত্তম, মধ্যম ও পিছিয়ে পড়া। যারা পিছিয়ে পড়া, তাদের নিয়ে বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯৭ শতাংশ পড়তে ও লিখতে পারে। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ করা হয়। অভিভাবকরাও সহযোগিতা করেন। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সহায়ক হিসেবে রয়েছে সততা স্টোর ও পরামর্শ বক্স। প্রতিটি ক্লাসরুম সাজানো-গোছানো। এছাড়া বিভিন্ন ক্লাস ও সিঁড়িতে ভালোকথা লেখা রয়েছে। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষক সংখ্যা অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খোঁজ নিতে রাতে বাড়ি বাড়ি যান শিক্ষকরা। বিদ্যালয় থেকে ২০২৫ সালে ৩৪ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৩০ জন বৃত্তি পেয়েছে।
তিনি কখনো স্কুল ফাঁকি দেননি। স্কুলে সবার আগে সকাল সাড়ে ৮টায় আসেন এবং সাড়ে ৪টায় বাসায় ফেরেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ দিয়ে থাকেন। প্রতিটি শিক্ষার্থীর খেলাধুলা, গান, ব্যায়াম ও গল্প বলার চর্চা করা হয়। বিদ্যালয়ে রয়েছে বাংলা ক্লাব, গণিত ক্লাব ও ইংরেজি ক্লাব। এসব ক্লাবের মাধ্যমে অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি বিজ্ঞান মেলারও আয়োজন করা হয়।
প্রতি শনিবার শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিদ্যালয়ের শ্রেণিভিত্তিক মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বাড়ির কাজ দেওয়া হয়। এতে শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে লিখে না নিলেও অভিভাবকরা বাড়ির কাজ সম্পর্কে জানতে পারেন। সময়ের কাজ সময়ে করতে পছন্দ করেন। আমরাও তার মতো হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তিনি বিদ্যালয়ের সময়ের বাইরে নিজের জন্য সময় না দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য সময় ব্যয় করেন।
শিক্ষিকা মাহামুদা আক্তার জানান, তিনি এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন, এখন এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন। তার চোখে দেখা একজন কঠোর পরিশ্রমী শিক্ষক তিনি। তিনি সবসময় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে ইনোভেটিভ চিন্তা করে থাকেন। শিক্ষকদের নিয়ে সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক সভা করেন। কীভাবে আরও ফলপ্রসূ করা যায়, সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষার জন্যও চিন্তাভাবনা করেন।
শিক্ষক কবির হোসেন বলেন, তিনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তরিক। দক্ষতার সঙ্গে বিদ্যালয়ের পাঠদান ও পরিচালনা করেন। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে কাজ করেন।
অভিভাবক কেয়া মৌল্লিক মৌমিতা বলেন, প্রধান শিক্ষক নিজে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় দাঁড়িয়ে থাকেন। শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, গান, ব্যায়াম ও নৈতিক শিক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দেন। তার নেতৃত্বে বিদ্যালয়ের পরিবেশ অনেক সুন্দর হয়েছে। আমাদের সন্তানদের নিয়ে আমরা আগের চেয়ে বেশি নিশ্চিন্ত।
শিক্ষার্থী ফারাজ ইবনে বশির জানান, আমার প্রধান শিক্ষক নিয়মিত সারিবদ্ধভাবে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ করান। বিদ্যালয়ে ভাষা ক্লাব, বাংলা ক্লাব, গণিত ক্লাব ও ইংরেজি ক্লাব পরিচালনা করেন। বিদ্যালয়ে ছাদবাগান করেন এবং আমাদের খুব যত্ন করেন। আমরা শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষককে ছাদবাগান করা ও স্কুল পরিচ্ছন্নতার কাজে সহযোগিতা করি।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের কাজের গতিশীলতা আনা, মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রদান করা হয়। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের গণ্ডি পেরিয়ে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করা হয়।

বাংলাধারা/ডেস্ক

মন্তব্য করুন