ঢাকা, সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৬ মাঘ ১৪৩২

নতুন প্রজন্মের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে: প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২৬, ০৮:২৩ সকাল  

ছবি: সংগৃহিত

নতুন প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, আমরা কেউই চিরস্থায়ী নই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ত্যাগ আর আদর্শ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকতে হবে। নতুন প্রজন্ম যেন জানে, এই দেশ কোথা থেকে এলো, কীভাবে যুদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধ তো শুধু একবার হয়নি, সামনে আরও লড়াই আসবে।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম। এছাড়া জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের শীর্ষ পর্যায়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করা এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের আলাদা করার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্ভব শ্রদ্ধা করে। সেই শ্রদ্ধাকে পুঁজি করে অতীতে অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করেছে। রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানীরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে খেলার পুতুলে পরিণত করেছিল। আমাদের লক্ষ্য ছিল এগুলোকে আবার প্রকৃত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানো।

মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকে গর্বের বিষয় উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ইতিহাস সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা একটি পবিত্র দায়িত্ব। আর কয়েক বছর পর নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাদের স্মৃতি, ত্যাগ আর আদর্শ ধরে রাখতেই হবে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি যেন জাতির মধ্যে অবিনশ্বর হয়ে থাকে, সেই পরিকল্পনা এখন থেকেই নিতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেন, অতীত সরকার মুক্তিযোদ্ধার চেতনার কথা বলে বিভাজন সৃষ্টি করেছে এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিত করেছে। তিনি জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের হারানো সম্মান ও ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধারা প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ ও গণভোট আয়োজনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তারা বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ বন্ধ হবে এবং সরকার জনগণের কাছে আরও জবাবদিহিমূলক হবে।

গণভোট প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা জানান, গণভোটে ‘না’ বিজয়ী হলে তা দেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হবে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে তারা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেবেন বলেও জানান।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা এখন নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সংবিধান সংস্কারের একটি বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। সংস্কার না হলে পরিবর্তনও আসবে না, আর আমরা ঘুরে ফিরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকব।

বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধারা আক্ষেপ করে বলেন, বিগত ১৬ বছরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে তারা নিজেদের পরিচয় দিতেও সংকোচ বোধ করতেন। অনেক সময় মানুষ প্রশ্ন করত, “আসল না নকল?”

ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হুদা বলেন, বর্তমান সরকার বাকস্বাধীনতার যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, তা অতীতের দীর্ঘ সময়েও দেখা যায়নি। তিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে সেতুবন্ধনের কথা তুলে ধরে বলেন, নতুন প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধাদেরই উত্তরসূরি।

বৈঠকের শেষে প্রধান উপদেষ্টা মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে সংগঠনগুলোর সম্পদ ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। “সরকারি উদ্যোগ থাকবে, তবে নাগরিক হিসেবেও আপনাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমি হয়তো আর কয়দিন পর সরকারে থাকব না, কিন্তু নাগরিক হিসেবে দেশের জন্য কাজ করে যাব।”

বৈঠকে তিনটি সংগঠনের নেতারা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে জানান, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।

বাংলাধারা/এসআর