ঢাকা, সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৬ মাঘ ১৪৩২

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক চুক্তি আজ: তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ও ২০ শতাংশ শুল্ক কমার সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ০৯, ২০২৬, ০৮:৩২ সকাল  

ছবি: সংগৃহিত

জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে আজ সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুল আলোচিত পাল্টা (রেসিপ্রোকাল) শুল্ক-সংক্রান্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে বাংলাদেশে উৎপাদিত তৈরি পোশাক দেশটির বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর বর্তমানে আরোপিত ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

তবে নির্বাচনের ঠিক আগে অন্তর্বর্তী সরকারের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান হলো, এটি কোনো আকস্মিক উদ্যোগ নয়; বরং দীর্ঘদিনের আলোচনার ধারাবাহিকতা এবং রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আজই চুক্তি স্বাক্ষর

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আজ সোমবার ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা) আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান সরাসরি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন না। পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বর্তমানে ওয়াশিংটনে অবস্থান করছে। অনলাইন মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে উপদেষ্টা ও সচিব চুক্তিতে অংশ নেবেন।

প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) অনুবিভাগের প্রধান খাদিজা নাজনীন। অন্য সদস্যরা হলেন, যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ শামসুল আরেফীন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কমিশনার রইছ উদ্দিন খান।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাণিজ্য উপদেষ্টা ঢাকায় বসেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। তাঁর স্বাক্ষরিত কপি প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে ওয়াশিংটনে নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিয়েসন গ্রিয়ার।

শুল্ক আরও কমার ইঙ্গিত

রোববার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় আরোপিত অতিরিক্ত ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরও কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে ঠিক কত শতাংশ কমবে, সে বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বলতে চাননি। তাঁর মতে, চলমান আলোচনার মধ্যে নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করলে দরকষাকষিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে শুল্ক শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। চুক্তি চূড়ান্ত হলে এবং উভয় পক্ষ সম্মত হলে শর্তাবলি প্রকাশ করা হবে।

কেন নির্বাচনের আগে এই চুক্তি

নির্বাচনের ঠিক আগে কেন এই চুক্তি, এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ঝুঁকি এড়াতেই সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। সেখানে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়তে পারে।

তিনি আরও বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করতে বড় অঙ্কের পণ্য ক্রয় বা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। সে বাস্তবতায় বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

নথি ফাঁস ও দরকষাকষির জটিলতা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়েই চুক্তির কিছু নথি প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে। তাঁর দাবি, এসব তথ্য বাইরে না এলে শুল্ক ২০ শতাংশের নিচে নামানো আরও সহজ হতে পারত।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতা করছে। বাংলাদেশও সেই প্রক্রিয়ার অংশ। আলোচনার আগে বা চলাকালে নথি ফাঁস হলে দরকষাকষিতে দেশের অবস্থান দুর্বল হয়।

উপদেষ্টা জানান, নথিগুলো বাংলাদেশ থেকেই প্রকাশ পেয়েছিল। তবে তাতে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার মতো কিছু ছিল না। চুক্তি সইয়ের পর উভয় পক্ষের সম্মতিতে সব তথ্য প্রকাশ করা হবে।

বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রসঙ্গ

চুক্তি আলোচনার অংশ হিসেবে বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টিও উঠে আসে। এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, এটি নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নয়। বিমানের বহর সম্প্রসারণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই পরিকল্পনায় রয়েছে।

তিনি জানান, বিমানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে বহরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উড়োজাহাজ যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। বর্তমানে বিমানের কার্যকর উড়োজাহাজ প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে বিপুলসংখ্যক যাত্রী বিদেশি এয়ারলাইন্সে ভ্রমণ করছেন। এতে দেশ থেকে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যাচ্ছে।

বশিরউদ্দীন বলেন, বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কিনতে সম্ভাব্য ব্যয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। তবে এই অর্থ এককালীন নয়, দীর্ঘমেয়াদে কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আজকের এই চুক্তিকে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের প্রাক্কালে এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাধারা/এসআর