গুজব ও মিথ্যা প্রচারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, আক্রান্ত মূলধারার সংবাদ মাধ্যম
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৩:৫০ দুপুর
মোঃ নাজিম উদ্দিন, সাংবাদিক ও লেখক
ডিজিটাল যুগে তথ্য পাওয়ার গতি যত বেড়েছে, সত্য-মিথ্যার বিভাজন ততই জটিল হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজ আর কেবল ব্যক্তিগত মত প্রকাশের জায়গা নয়; এটি রাজনৈতিক প্রচারণা, জনমত গঠন এবং কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। গুজব ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা তথ্যের স্রোতে এখন সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদ মাধ্যম।
একসময় সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও রেডিও ছিল তথ্যের প্রধান ও বিশ্বাসযোগ্য উৎস। কিন্তু ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মে যাচাইহীন তথ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে লাখো মানুষের কাছে। ফলশ্রুতিতে, মূলধারার সংবাদ মাধ্যমকে পড়তে হচ্ছে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, সংবাদ যাচাইয়ের সময়টুকুও অনেক সময় জনমতের কাছে বিলম্ব হিসেবে ধরা পড়ছে।
রাজনীতি ও গুজবের সমীকরণঃ
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুজব নতুন নয়, তবে ডিজিটাল মাধ্যম একে দিয়েছে বহুগুণ শক্তি। নির্বাচন, আন্দোলন, সহিংসতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিগত চরিত্রহনন, সব ক্ষেত্রেই গুজব এখন রাজনৈতিক অস্ত্র। ফেক আইডি, পেজ ও বেনামি ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে ছড়ানো হয় আংশিক সত্য, পুরনো ছবি বা ভিন্ন ঘটনার ভিডিও।
অনেক সময় দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো একটি গুজবকে কেন্দ্র করে মূলধারার সংবাদ মাধ্যমকেও চাপের মুখে পড়তে হয়। “এই খবর কেন দিচ্ছেন না?” এমন প্রশ্নে পাঠক বা দর্শকের কাছে জবাবদিহির জায়গায় পড়ে যায় দায়িত্বশীল সংবাদ মাধ্যম, যদিও সেই তথ্য যাচাইযোগ্য নয় বা পুরোপুরি মিথ্যা।
মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের সংকটঃ
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সংকটটি হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা। গুজব যখন সত্যের মতো করে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মূলধারার গণমাধ্যম সত্য বললেও অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখেন। কেউ কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেই “স্বাধীন ও
সাহসী সংবাদ” হিসেবে তুলে ধরতে চান, যেখানে পেশাগত নীতিমালা বা দায়বদ্ধতার প্রশ্ন নেই।
এদিকে প্রতিযোগিতার চাপে কিছু কিছু গণমাধ্যমও অনিচ্ছাকৃতভাবে যাচাইয়ের মানদণ্ডে ছাড় দিচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে গুজব বনাম সংবাদ এই দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো তথ্য পরিবেশ।
গণতন্ত্র ও সমাজে প্রভাবঃ
গুজব ও মিথ্যা তথ্যের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জনমত সিদ্ধান্ত গ্রহণকে করে বিভ্রান্ত। সামাজিক বিভাজন বাড়ে, সহনশীলতা কমে, আর ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট মোকাবেলায় এককভাবে রাষ্ট্র বা গণমাধ্যমের পক্ষে সফল হওয়া কঠিন। প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ—
- সংবাদ মাধ্যমের আরও শক্তিশালী ফ্যাক্ট চেকিং ব্যবস্থা
- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে নাগরিক সচেতনতা
- ডিজিটাল সাক্ষরতা শিক্ষা
- এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখে দায়বদ্ধতার চর্চা
শেষবাক্যে, গুজব ও মিথ্যা প্রচার কেবল একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং তথ্যের নৈতিক ব্যবহারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে দোষারোপ করেই সমস্যার সমাধান হবে না, আবার মূলধারার সংবাদ মাধ্যমকেও আত্মসমালোচনার বাইরে রাখা যাবে না।
সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন তবু গণতন্ত্র, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এই লড়াই চালিয়ে যেতেই হবে।
বাংলাধারা/এসআর
